[email protected] শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
২৩ কার্তিক ১৪৩৩

ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েই জয়, মার্কিন রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিলেন আবদুল এল-সায়েদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ নভেম্বর ২০২৬ ৭:৩৯ পিএম

সংগৃহীত ছবি

ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও ইসরায়েলের নীতির সমালোচনায় সরব থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে বড় সাফল্য পেয়েছেন আবদুল এল-সায়েদ।

তার এই বিজয় মার্কিন রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া নির্বাচনে জয়ের পথে বাধা নয়, বরং তা ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে—এমন বার্তা উঠে এসেছে এই ফলাফলে।

 

গত ৩ নভেম্বর মিশিগানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এল-সায়েদ ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন। রজার্স পেয়েছেন ৪৬ শতাংশ ভোট।

 

এই জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম-আমেরিকান হিসেবে জায়গা করে নেওয়ার ইতিহাস গড়েছেন এল-সায়েদ। পাশাপাশি তিনি সিনেটে নির্বাচিত ষষ্ঠ আরব-আমেরিকান।

 

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সামগ্রিক সাফল্যের মধ্যেও এল-সায়েদের জয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণও দলটির হাতে এসেছে।

 

তবে তার বিজয়ের তাৎপর্য শুধু নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মিশিগানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে ইসরায়েলের সমালোচনা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েও নির্বাচনে জয়ী হওয়া মার্কিন রাজনীতির প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

 

ইসরায়েল ইস্যুতে প্রশ্নের মুখে এল-সায়েদ

নির্বাচনী প্রচারণার সময় এল-সায়েদকে বারবার ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে তিনি এ ধরনের প্রশ্নের ক্ষেত্রে দ্বৈত নীতির বিষয়টি সামনে আনেন।

 

তার বক্তব্য ছিল, রাজনীতিবিদদের কাছে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার কিংবা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয়ে একইভাবে জানতে চাওয়া হয় না কেন?

 

এল-সায়েদ ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূখণ্ডে নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সমান মর্যাদা নিয়ে বসবাসের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়েও সমর্থন জানিয়েছেন।

 

গত সেপ্টেম্বরে মিশিগানের কয়েকজন রাব্বি, ক্যান্টর ও ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতার উদ্যোগে ‘নননেগোশিয়েবল মিশিগান’ নামে একটি প্রচারাভিযান শুরু হয়। জিওনেস অ্যাকশন ফান্ডের সহায়তায় পরিচালিত এ উদ্যোগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও নেতাদের কাছে পাঁচটি নীতিগত বিষয়ে প্রতিশ্রুতি চাওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল ইহুদিদের নিরাপত্তা, পরিচয়ের অধিকার, ইসরায়েলে ইহুদিদের সার্বভৌমত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান।

 

সমালোচকদের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইসরায়েলকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অবস্থানকে নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতার অন্যতম শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল।

 

এল-সায়েদের অবস্থান ছিল, ইহুদি নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও সমানভাবে স্বীকৃত হওয়া প্রয়োজন। ইসরায়েলের সরকারি নীতির সমালোচনাকে ইহুদিবিদ্বেষের সঙ্গে এক করে দেখার প্রবণতারও বিরোধিতা করেছেন তিনি।

 

পরিচয়কে কেন্দ্র করে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা

নির্বাচনী প্রচারণায় এল-সায়েদের আরব ও মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স ও তার সমর্থকেরা তার ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়কে রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হিসেবে সামনে আনেন।

 

এল-সায়েদের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহ, হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ তোলা হয়। এমনকি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার প্রতি তার সমর্থন রয়েছে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন—এমন প্রচারণাও চালানো হয়।

 

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদনে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। এল-সায়েদের সমর্থকেরা এসব প্রচারণাকে মুসলিম ও আরব পরিচয়ের কারণে তাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার চেষ্টা হিসেবে দেখেছেন।

 

নির্বাচনী প্রচারের সময় তাকে বারবার নিজের আমেরিকান পরিচয় তুলে ধরতে হয়েছে। তিনি মিশিগানে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং অন্য নাগরিকদের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের একজন নাগরিক—এ বিষয়টিও সামনে আনতে হয়েছে।

 

ভয়ভীতির প্রচারণা প্রত্যাখ্যান ভোটারদের

নিজের বিজয়ের প্রতিক্রিয়ায় এল-সায়েদ বলেন, ‘খারাপ লোকেরাই হেরেছে।’ তার এই বক্তব্য নির্বাচনী প্রচারণায় ছড়িয়ে দেওয়া বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতির প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

 

মিশিগানের ভোটারদের রায়কে অনেকে ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়কেন্দ্রিক প্রচারণার বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে এই ফলাফল ডেমোক্র্যাট দলের প্রগতিশীল রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

 

দলটির প্রচলিত নেতৃত্বের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে মনে করে এসেছে, অতিরিক্ত প্রগতিশীল অবস্থান নির্বাচনে জয় পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে। কিন্তু এল-সায়েদের বিজয় সেই ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সব মিলিয়ে তার এই সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিলিস্তিন ইস্যু, মুসলিম-আমেরিকানদের প্রতিনিধিত্ব এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্ব নিয়ে নতুন বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

এফ/ডি

সম্পর্কিত খবর