[email protected] শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

দ্বন্দ্ব ভুলে মিত্র হতে যাচ্ছে সৌদি ও আমিরাত!

প্রতিদিনের বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০৭ পিএম

সংগৃহীত ছবি

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কি পুনরায় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে?

 অবস্থাদৃষ্টে তা-ই মনে হচ্ছে। গত মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও উপপ্রধানমন্ত্রী মনসুর বিন জায়েদ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রিয়াদে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সালমানের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলে ছিলেন সৌদির প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, সুপ্রিম কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটির মহাসচিব আলী আল শামসি, ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি, ক্রাইসিস অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান আলী আল নেয়াদিসহ অন্যরা।

​সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান জাতীয় দৈনিক ‘দ্য ন্যাশনাল’ এই বৈঠক সম্পর্কে লিখেছে, সফরটি রিয়াদ ও আবুধাবির গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বের প্রতিফলন। দেশ দুটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রেখে আসছে এবং যৌথ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজেদের অবস্থান সমন্বয়ের লক্ষ্যে উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিত যাতায়াত করে থাকেন।

​দৃশ্যত মনে হচ্ছিল তারা যেন চিরকালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অথচ বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমতের কারণে সম্প্রতি তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল, বিশেষ করে ইয়েমেন ইস্যুতে। ইয়েমেন সংকট ছিল সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ। ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট আবদুর রাব্বু মনসুর হাদির সরকার রক্ষায় শুরুতে সৌদি ও আমিরাত এক জোট হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নীতি পৃথক হয়ে যায়। সৌদি আরব ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন অব্যাহত রাখলেও আমিরাত ‘সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এসটিসি)’ সহায়তা দেওয়া শুরু করে। পরবর্তী সময়ে হোদেইদাহ বন্দরসহ দক্ষিণাঞ্চল সুরক্ষিত মনে হলে আমিরাত যুদ্ধ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়, যদিও সৌদি চেয়েছিল পুরো ইয়েমেনকে হুথিমুক্ত করতে।

​এ ছাড়া সুদান ও ইরান ইস্যু, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন ছিল। এ কারণেই সৌদি নেতৃত্বাধীন ওপেক (OPEC) থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবতে পেরেছিল আমিরাত। পাশাপাশি আব্রাহাম অ্যাকর্ডের আওতায় ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা প্রথম দেশ হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত, যেখানে সৌদি আরব সরাসরি এমন পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত ছিল। তবে বর্তমানে হুথির হুমকির মুখে সৌদি আরব ইসরাইলের পরিবর্তে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে মনোযোগ দিয়েছে।

​তবে কি পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে? লক্ষণীয় বিষয় হলো, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আবুধাবি সফরের ঠিক পরদিনই সৌদি সফর করেন আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট মনসুর বিন জায়েদ। আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফরের উদ্দেশ্য দ্বিপক্ষীয় আলোচনা বলা হলেও, ইসরাইলি গণমাধ্যমের দাবি—বৈঠকে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও ইরান এবং হুথির মতো ‘যৌথ হুমকি’ মোকাবেলায় আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামো গঠন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

​অতীতে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে ইরান এবং লক্ষ্যবস্তু করেছে মার্কিন ঘাঁটিগুলো। এ ছাড়া ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া ও হুথিদের নিয়মিত হামলার মুখে পড়েছে রিয়াদ। ইরান শুধু সামরিক আঘাতই হানেনি, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে অর্থনৈতিক ক্ষতিও চাপিয়ে দিয়েছে। অন্য দিকে হুথিরা সৌদির তেল পাইপলাইন ও বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হানছে। এক দশক ইয়েমেন সংকটে ভুগে ২০২২ সালে নিস্তার পেলেও, সেই পুরোনো হুমকি আবারও নতুন করে ফিরে এসেছে।

​চলতি বছরের শুরুর দিকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উদ্যোগে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার ও আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ সুরক্ষায় একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করা হলেও তা হুথিদের দমাতে পারেনি। এরপর রিয়াদ পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে আঞ্চলিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেয়েছিল, কিন্তু হুথিরা সেই ব্যবস্থারও সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করে দেয়। মার্কিন প্রশাসন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে রাজি হলেও হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি নাকচ করায় সৌদি আরব চীনের দারস্থ হয়, যাতে তারা ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে এই গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করে।

​এমতাবস্থায়, উপসাগরীয় অঞ্চলের সংহতি ও অভ্যন্তরীণ সহযোগিতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি সৌদি আরবের শুরা কাউন্সিলে দেওয়া ভাষণে যুবরাজ সালমান বলেন, জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর ওপর হামলা প্রমাণ করে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অবিচ্ছেদ্য। তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত অখণ্ডতা রক্ষায় মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে একযোগে কাজ করছেন।

​এ ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অতীতে মুসলিম ব্রাদারহুড নিয়ন্ত্রণ, আধুনিকায়ন, সিরিয়া, কাতার কিংবা তুরস্ক ইস্যুতে উভয় দেশের নীতিতে যথেষ্ট মিল ছিল। এমনকি মোহাম্মদ বিন জায়েদকে একসময় মোহাম্মদ বিন সালমানের পরামর্শদাতা বা মেন্টর হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

​দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের প্রচেষ্টা আগেও দেখা গেছে। জুলাই মাসে সৌদি আরবের ন্যাশনাল মিডিয়া অথরিটির চেয়ারম্যান শেখ আবদুল্লাহ আল হামেদ দুই দেশের ঐতিহাসিক ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। আগস্টে প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ সৌদি বাদশাহ সালমানকে ডিসেম্বরে আবুধাবিতে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের পানিবিষয়ক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠান।

​অন্যদিকে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ইরান নিয়ে আলোচনার জন্য সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় মনে হচ্ছে, সৌদি আরব ইয়েমেনে পুনরায় প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ না করে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখতে চাইছে, যাতে তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।

​১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লবের পর যে লক্ষ্য নিয়ে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) গঠিত হয়েছিল, মার্কিন ও ইসরাইলি সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তারা ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলো প্রকাশ পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ও আমিরাতের যৌথ অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একক দাবির চেয়ে জিসিসির সম্মিলিত দাবি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অধিক কার্যকর হবে। পাশাপাশি সৌদি আরব 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে' যোগ না দিয়েও যদি ইসরাইলের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করতে চায়, তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি মধ্যস্থতাকারী বা রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারবে। বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন সমঝোতা পর্বের সূচনা হতে যাচ্ছে।

এসআর

সম্পর্কিত খবর