[email protected] শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্যেই মতবিরোধ ভারতের

প্রতিদিনের বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৫০ এএম

সংগৃহীত ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে এবার

 প্রকাশ্যেই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে ভারত। বাণিজ্যনীতি, রাশিয়া থেকে তেল কেনা, পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে ওয়াশিংটনের নীতির বিষয়ে আপত্তি জানাচ্ছে নয়াদিল্লি।

​ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক বক্তব্যে দুই দেশের সম্পর্কে জমে থাকা মতপার্থক্যগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্কে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতিকে ‘আত্মকেন্দ্রিক’ বলে অভিহিত করেন এবং ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ, বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ওয়াশিংটনের ভূমিকা ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন মতবিরোধের বিষয়গুলো কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ রাখত নয়াদিল্লি। তবে কয়েক মাসের তীব্র টানাপোড়েনের পর ভারত এখন প্রকাশ্যে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করেছে।

​বাণিজ্য নিয়ে টানাপোড়েন

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে অন্যতম বড় বিরোধের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাণিজ্যনীতি। ২০২৫ সালে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে ভারতের পণ্য বাণিজ্যে ৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। জয়শঙ্কর মন্তব্য করেন, কোনো দেশ নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অন্য দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর তার প্রভাব পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

​বিশেষ করে কৃষি খাত নিয়ে দুই দেশের নীতিতে বড় ধরনের ব্যবধান বিদ্যমান। ভারতের কৃষি ও কৃষকদের সুরক্ষায় বাজারে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়, তাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সে বাজার উন্মুক্ত করার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয় বলে উল্লেখ করেন জয়শঙ্কর। পাশাপাশি রাশিয়া থেকে তেল আমদানির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য উচ্চ শুল্ক আরোপ নিয়ে ভারতে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, যা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও জটিল করতে পারে।

​পাকিস্তান ও সন্ত্রাসবাদ ইস্যু

দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনের অন্যতম কারণ পাকিস্তান নীতি। গত বছর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাতের পর ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, কাশ্মীর ইস্যুতে তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ শুরু থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে ভারত। এছাড়া পাকিস্তানের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতায় ভারত অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

​জয়শঙ্কর জোর দিয়ে বলেন, সন্ত্রাসবাদ ভারতের নিরাপত্তার জন্য একটি অতীব স্পর্শকাতর বিষয়। দীর্ঘদিন প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত পেরিয়ে আসা সন্ত্রাসবাদের মুখোমুখি হতে থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যথেষ্ট সহানুভূতি ও বোঝাপড়া না পাওয়া ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয়। সাবেক কূটনীতিক অজয় বিসারিয়ার মতে, মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর সম্পর্কের জটিলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতে নিজস্ব মতামত প্রকাশ্যে আনার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

​অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ভিসা নীতি

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই কঠোর অবস্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবও রয়েছে। আগামী বছর ভারতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে বিরোধীরা অভিযোগ তুলছে সরকার মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এইচ-১বি (H-1B) ভিসা নীতিতে আনা পরিবর্তন নিয়ে ভারতে ব্যাপক উদ্বেগ বিরাজ করছে, কারণ ভারতীয় দক্ষ কর্মীরাই এই ভিসার অন্যতম প্রধান সুবিধাভোগী ছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের আওতায় ভিসা প্রক্রিয়াকরণ এবং ফি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে ভারতের শ্রমশক্তি বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।

​ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সমীকরণ

সম্পর্কে নানা টানাপোড়েন ও প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দিলেও উভয় দেশই এই কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে চায় না। চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক চিয়েটিগ বাজপেয়ি উল্লেখ করেন, নীতিগত পার্থক্য থাকলেও সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন হতে পারে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অগ্রগতি মাপার মূল মানদণ্ড। অন্যদিকে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি হার্শ পান্ত জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক নীতিগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নয়াদিল্লি এখন নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ প্রকাশ্যে তুলে ধরছে।

এসআর

সম্পর্কিত খবর