ফুসফুস সুস্থ রাখার ক্ষেত্রে শুধু রোগবালাই থেকে দূরে থাকাই যথেষ্ট নয়, দৈনন্দিন জীবনযাপনের অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
ধূমপান, অন্যের ধোঁয়ার সংস্পর্শ, বায়ুদূষণ এবং দীর্ঘ সময় শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকার মতো বিষয়গুলো শ্বাসযন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন তথ্যেও তামাকের ধোঁয়া ও বায়ুদূষণকে দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে গেলে শ্বাস নিতে কষ্ট, দীর্ঘদিন কাশি থাকা, শ্বাসের সঙ্গে শব্দ হওয়া কিংবা সামান্য কাজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ফুসফুসের কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে স্পাইরোমেট্রি পরীক্ষা করা হয়। এতে ফুসফুসে কতটা বাতাস ধারণ হচ্ছে এবং কত দ্রুত তা বের করা সম্ভব হচ্ছে, তা পরিমাপ করা যায়।
ফুসফুসের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এমন কয়েকটি অভ্যাস হলো—
ফুসফুসের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর অভ্যাসগুলোর মধ্যে ধূমপান অন্যতম। সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের ধোঁয়ায় থাকা নানা রাসায়নিক শ্বাসনালি ও ফুসফুসে প্রদাহ তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘদিন ধূমপান করলে ফুসফুসের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ে। ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডির অন্যতম প্রধান ঝুঁকিও ধূমপান।
তাই ফুসফুস ভালো রাখার জন্য ধূমপান না করা এবং যারা ধূমপান করেন, তাদের এ অভ্যাস ছাড়ার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ।
নিজে ধূমপান না করলেও আশপাশের মানুষের সিগারেটের ধোঁয়া নিয়মিত শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকতে পারে। একে পরোক্ষ ধূমপান বলা হয়।
দীর্ঘদিন এ ধরনের ধোঁয়ার মধ্যে থাকলে শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা এবং ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ফলে বাসা, কর্মস্থল বা জনসমাগমস্থলে ধূমপানের ধোঁয়া থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা উচিত।
শহরের রাস্তায় যানবাহনের ধোঁয়া, ধুলাবালি ও বাতাসে থাকা ক্ষতিকর কণা নিয়মিত শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
একইভাবে কারখানার ধোঁয়া বা বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শেও শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
দীর্ঘদিন দূষিত পরিবেশে অবস্থান করলে শ্বাসযন্ত্রের নানা সমস্যার আশঙ্কা বাড়তে পারে। আগে থেকেই শ্বাসযন্ত্রের কোনো সমস্যা থাকলে সেটিও আরও তীব্র হতে পারে।
তাই অতিরিক্ত দূষিত এলাকায় অপ্রয়োজনে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করা এবং ধুলা, ধোঁয়া বা রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে কাজ করার সময় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নেওয়া জরুরি।
ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে ভেতরের বাতাসের মান খারাপ হতে পারে।
রান্নার ধোঁয়া, মশার কয়েল, তামাকের ধোঁয়া কিংবা বিভিন্ন জ্বালানি পোড়ানোর ফলে তৈরি ধোঁয়া ঘরের মধ্যে জমে শ্বাসযন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকলে রান্নার ধোঁয়া ও অন্যান্য দূষিত কণার সংস্পর্শ বেড়ে যায়। তাই ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা এবং রান্নার ধোঁয়া বাইরে বের হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার।
দিনের বড় একটি সময় বসে থাকা এবং নিয়মিত হাঁটাচলা বা ব্যায়াম না করার অভ্যাস শরীরের সামগ্রিক কর্মক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড শরীরকে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি শ্বাসযন্ত্রের সক্ষমতা বজায় রাখতেও সহায়ক।
তাই একটানা দীর্ঘ সময় বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটাচলা করা উচিত। নিজের বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম বা শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভ্যাস করাও উপকারী।
সর্দি-কাশি বা শ্বাসযন্ত্রের সামান্য সমস্যা হলেই নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া ঠিক নয়। কারণ সব ধরনের সর্দি-কাশি বা শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না।
অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে এর কার্যকারিতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই এ ধরনের ওষুধ ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ফুসফুস সুস্থ রাখতে ধূমপান পরিহার, দূষিত পরিবেশ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা, ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভ্যাস করা গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্ট, কাশি বা শ্বাসের সময় অস্বাভাবিক শব্দ হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
এসআর