আজ ২৪ অক্টোবর, জাতিসংঘ দিবস। বিশ্বজুড়ে শান্তি, উন্নয়ন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অঙ্গীকার নিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিশ্ববাসীকে ঐক্য, সংহতি ও অভিন্ন মূল্যবোধের প্রতি নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মানবতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শান্তি, উন্নয়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতার ওপর।
৮১ বছরে জাতিসংঘের অবদান
মহাসচিবের বার্তায় বলা হয়, গত ৮১ বছর ধরে জাতিসংঘ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে আসছে—মানবতার ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে বিশ্বকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
বিরোধ নিষ্পত্তিতে অস্ত্রের পরিবর্তে কূটনীতি ও আইন, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং যুদ্ধ, দুর্যোগ ও বাস্তুচ্যুতির শিকার মানুষের কাছে জীবনরক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
পরিবহন, বাণিজ্য ও প্রযুক্তির উন্নয়ন, মানুষ ও পৃথিবীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নারী ও মেয়েদের সমতা প্রতিষ্ঠা এবং তাদের জন্য সুযোগ সম্প্রসারণেও সংস্থাটির অবদান তুলে ধরেন গুতেরেস।
বিশ্বমঞ্চে সব দেশের সমান কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও জাতিসংঘকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
মহাসচিবের ভাষায়, জাতিসংঘ শুধু একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা নয়; এটি বিশ্বব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ।
সংকটে বিপর্যস্ত বিশ্ব, প্রয়োজন ঐক্য
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে গুতেরেস বলেন, বিশ্ব এখন সংঘাতে বিপর্যস্ত, জলবায়ু সংকটে ক্ষতবিক্ষত এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্যে জর্জরিত।
এর পাশাপাশি প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে প্রযুক্তিকে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতার চেয়ে এর অগ্রগতি দ্রুততর হয়ে উঠছে।
এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অভিন্ন মূল্যবোধের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বলে মনে করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
তিনি বলেন, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পেছনে যে মূল্যবোধ কাজ করেছে, সেগুলোর প্রতি নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার এখনই সময়।
‘বিভাজন নয় সংলাপ, সংঘাত নয় সহযোগিতা’
জাতিসংঘ দিবসের বার্তায় বিশ্ববাসীর প্রতি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান জানিয়েছেন আন্তোনিও গুতেরেস।
তিনি বলেন, বিভাজনের পরিবর্তে সংলাপ, সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা এবং ভয়ের পরিবর্তে সংহতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সব দেশের প্রতি অভিন্ন মূল্যবোধ এবং সেগুলোর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতার প্রতি অঙ্গীকার নবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
একই সঙ্গে জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখতে বিশ্বনেতাদের দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন মহাসচিব।
মানবতার স্বার্থে আরও শক্তিশালী জাতিসংঘ
বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং মানুষের কল্যাণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে জাতিসংঘকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন গুতেরেস।
তার মতে, বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা, উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং সংকটের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিকল্প নেই।
জাতিসংঘ দিবসের বার্তায় তাই বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখতে এবং মানুষের কল্যাণে সংস্থাটিকে আরও কার্যকর করে তুলতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
যেভাবে শুরু জাতিসংঘ দিবস
প্রতি বছর ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবস পালিত হয়। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৪৮ সাল থেকে দিনটি জাতিসংঘ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
জাতিসংঘ বিশ্বের স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। বর্তমানে এর সদস্যরাষ্ট্র ১৯৩টি। সংস্থাটির সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে অবস্থিত।
বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে সদস্যপদ লাভ করে।
জাতিসংঘের ছয়টি প্রধান অঙ্গ হলো সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ, সচিবালয়, অছি পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত।
সংস্থাটির বিভিন্ন বিশেষায়িত ও উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনেসকো, ইউনিসেফ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্বব্যাংক।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রয়েছে ১৫টি সদস্যরাষ্ট্র। এর মধ্যে পাঁচটি স্থায়ী ও ১০টি অস্থায়ী সদস্য। স্থায়ী সদস্যরাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে।
বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পর্তুগালের নাগরিক। তিনি জাতিসংঘের নবম মহাসচিব। সংস্থাটির প্রথম মহাসচিব ছিলেন নরওয়ের ট্রিগভে লি।
জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ছয়টি—ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, রুশ, স্প্যানিশ ও আরবি। তবে সচিবালয়ের কার্যকরী ভাষা ইংরেজি ও ফরাসি।
১৯৪৫ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে জাতিসংঘ সনদ স্বাক্ষরিত হয়। সনদে রয়েছে ১৯টি অধ্যায় ও ১১১টি অনুচ্ছেদ। মূল সনদে ৫০টি রাষ্ট্র স্বাক্ষর করলেও পরবর্তীতে পোল্যান্ড স্বাক্ষর করায় প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরাষ্ট্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫১টি।
জাতিসংঘ দিবসের এবারের বার্তা স্পষ্ট—সংঘাত ও সংকটের এই সময়ে মানবতার ভবিষ্যৎ রক্ষায় বিশ্বকে বিভাজনের পথ ছেড়ে সংলাপ, সহযোগিতা ও সংহতির পথে এগিয়ে আসতে হবে।
এসআর