ব্যাংকক থেকে: বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি বাড়ছে। চলতি ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল।
‘রেজিলিয়েন্স আন্ডার স্ট্রেইন, আর্জেন্ট চয়েসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আইএমএফ জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, চলতি বছর বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ালেও আগামী বছর তা কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে। তবে এই পূর্বাভাস বাস্তবায়ন নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক পরিবেশের ওপর।
আইএমএফের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, একের পর এক অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলেও বিশ্ব অর্থনীতি এখন পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রেখেছে। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি বজায় রাখতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, মজুত ব্যবহার এবং সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে তুলনামূলক সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে।
তবে এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়তে পারে। এতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়ের চাপ এবং সরকারি ভর্তুকির প্রয়োজন বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
জ্বালানি আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ। এসব দেশে জ্বালানি আমদানিতে বেশি অর্থ ব্যয় হলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও বিনিময় হারের ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। সরকারের রাজস্ব আয় ও আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হলে সাধারণ মানুষকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়াও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও এ ধরনের ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হতে পারে। প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমে যাওয়ার অর্থ হলো, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যাশিত গতিতে সম্প্রসারিত না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির বাস্তব পরিস্থিতি নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি, বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতির ওপর।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম ঝুঁকি। বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ, শুল্ক বৃদ্ধি এবং উৎপাদনব্যবস্থায় পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ২০২৬ সালে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাণিজ্য উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে পণ্য সরবরাহ ও উৎপাদনব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপও বিশ্ব অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশে ঋণের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা, বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং জাতীয় নিরাপত্তা খাতে সরকারের অর্থের চাহিদা বাড়ছে। ফলে নতুন কোনো অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিলে তা মোকাবিলায় অনেক সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
এ ছাড়া জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, সাইবার আক্রমণ এবং চরম আবহাওয়ার মতো ঘটনাও বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব কারণে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব পড়তে পারে বাজারদর ও মূল্যস্ফীতিতে।
আইএমএফের সামগ্রিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্বঅর্থনীতি এখনো প্রবৃদ্ধির পথে থাকলেও ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশগুলোকে সতর্ক নীতি গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর ও অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এসআর