বাংলাদেশে যক্ষ্মা (টিবি), এইচআইভি/এইডস ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং এসব রোগে মৃত্যুহার কমাতে তিন বছর মেয়াদি একটি বড় প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ করেছে সরকার। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৩৯ কোটি টাকা।
প্রকল্পের মোট অর্থের মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৩ হাজার ১৬৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা এবং গ্লোবাল ফান্ডের অনুদান থেকে ৮৭০ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।
বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের নতুন শনাক্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রকল্পে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এ রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে দেশে নতুন করে ১ হাজার ৮৯১ জনের এইচআইভি শনাক্ত হয়। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৩৮। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নতুন শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে।
তবে এইচআইভি-সংক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। ২০২৪ সালে ৩২৬ জনের মৃত্যু হলেও ২০২৫ সালে এ সংখ্যা নেমে আসে ২৫৪ জনে।
এতদিন দেশে এইচআইভি সেবা মূলত ২৩টি অগ্রাধিকার জেলার মধ্যে কেন্দ্রীভূত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এসব জেলার বাইরেও নতুন সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে।
২০২৫ সালে শনাক্ত হওয়া নতুন রোগীদের মধ্যে ৩৩৪ জন বা প্রায় ১৭ শতাংশ ছিলেন অগ্রাধিকার এলাকার বাইরের জেলার বাসিন্দা।
এই পরিস্থিতিতে দেশের ৬৪ জেলার জেলা হাসপাতালগুলোতে এইচআইভি পরীক্ষা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্ভাব্য এইচআইভি/এইডস আক্রান্তদের ৯৫ শতাংশ শনাক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
দেশে আনুমানিক ১৭ হাজার ৭০০ জন এইচআইভি আক্রান্ত রয়েছেন বলে প্রকল্পের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনার পাশাপাশি চিকিৎসাধীনদের ৯৩ শতাংশের ভাইরাল লোড নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের উচ্চ টিবি-ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি দেশের তালিকায় রয়েছে। WHO-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার মানুষ টিবিতে আক্রান্ত হন এবং ৪৪ হাজারের মৃত্যু হয়।
২০১৫ সালের তুলনায় টিবিতে মৃত্যুর হার প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। তবে নতুন আক্রান্তের হার খুব বেশি কমেনি।
সরকারের নতুন প্রকল্পে অনুমান করা টিবি রোগীর ৮৫ শতাংশ শনাক্ত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ফুসফুসের টিবি রোগীর সংস্পর্শে আসা প্রায় ১৫ লাখ মানুষকে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রায় ৮ লাখ ২৪ হাজার টিবি রোগীকে পুষ্টি সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া নির্মূলের আগের লক্ষ্য ছিল ২০৩০ সাল। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতি ও বিভিন্ন বাস্তব চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় সেই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩৪ সাল করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ সালে দেশে ম্যালেরিয়া আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫৫ হাজার ৮৭৩। ২০২৫ সালে তা কমে ১০ হাজার ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ৭ হাজার ২ জন ম্যালেরিয়া রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ১০ জন।
নতুন প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্যালেরিয়ার বার্ষিক আক্রান্তের হার প্রতি ১ হাজারে একজনের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি ২০২৯ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টিবি, এইচআইভি ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমকে একই প্রকল্পের আওতায় আনার ফলে মাঠপর্যায়ে সমন্বয় বাড়বে।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়ন ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে দেশের রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিগুলোকে আরও সমন্বিত ও টেকসই করার লক্ষ্যেই নতুন প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে।
এসআর