রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। রাতের নির্জন গলি থেকে শুরু করে ব্যস্ত সড়ক, বাজার কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান—বিভিন্ন স্থানে গুলি চালিয়ে হত্যা ও হামলার ঘটনা ঘটছে।
সাম্প্রতিক দুই দিনে গুলি করে হত্যার অন্তত পাঁচটি ঘটনা ঘটেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক বাড়ছে।
রোববার গভীর রাতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুর এলাকার সরদার গলিতে সাগর খান ইমরান (৪০) ও বিদ্যুৎ জাকারিয়া (৩২) নামে দুই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় একদল সশস্ত্র যুবক। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, চারটি মোটরসাইকেলে করে সাত থেকে আটজন হেলমেটধারী যুবক সেখানে আসে। তারা দুজনকে ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে ইমরানকে দৌড় না দেওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পরই এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া হয়। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে পড়ে যান ইমরান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ জাকারিয়া বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এর একদিন পর সোমবার বিকেলে পাবনার আটঘরিয়ার একদন্তে আদম আলী (৬০) নামে এক বিএনপি নেতাকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বাজার করে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার সময় চন্ডীপাশা এলাকায় দুর্বৃত্তরা তার পথরোধ করে। প্রথমে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। একপর্যায়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। নিহত আদম আলী স্থানীয় বিএনপির এক নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি ছিলেন।
এর আগের দিন শনিবার রাত ৮টার দিকে যাত্রাবাড়ীর কদমতলীর শনিরআখড়া এলাকার জিয়া সরণি রোডে নিজের ক্রোকারিজের দোকানে বসে থাকা ব্যবসায়ী আসলাম খান (৩৮) গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয় সূত্র জানায়, এক হামলাকারী দোকানে ঢুকে তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে তার বাম হাত ও মুখের ডান পাশে গুলি লাগে। জমি নিয়ে পূর্বশত্রুতার জেরে এ হামলা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। পরে স্থানীয়রা মঞ্জুরুল ইসলাম নামে এক হামলাকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। তার কাছ থেকে একটি পিস্তল, একটি রিভলবার ও নয় রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাতের অন্ধকারের পাশাপাশি দিনের ব্যস্ত সময়েও প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। ব্যস্ত সড়ক, বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে গুলি চালানোর ঘটনায় নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তুচ্ছ বিরোধ, মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি কিংবা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর মতো ঘটনায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হামলাকারীদের গ্রেফতার করলেও এসব অস্ত্রের উৎস ও জোগানদাতাদের বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই সামনে আসে না।
শুধু গোলাগুলি নয়, ব্যস্ত সড়কে ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। গত ২৯ আগস্ট ভোরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে রিকশায় যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারীর টানে রিকশা থেকে পড়ে যান স্কুলশিক্ষিকা রনজিনা পারভীন (৫৫)। পরে তার মৃত্যু হয়।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে সারা দেশে ৯৩৪টি হত্যামামলা হয়েছে। অর্থাৎ ওই সময়ে প্রতি মাসে গড়ে ৩০০টির বেশি এবং প্রতিদিন গড়ে ১০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে। এছাড়া ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে বিভিন্ন অপরাধে সারা দেশে ৯৯ হাজার ৯৯২টি মামলা হয়েছে, যা আগের ছয় মাসের তুলনায় ১০ হাজার ৯৮০টি বেশি। এই ছয় মাসে হত্যামামলা হয়েছে ১ হাজার ৭৮৯টি।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে অন্তত ১২৩টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এর বড় অংশ ঘটেছে মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে। এসব ঘটনায় অন্তত ৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে প্রায় ৪০০টি রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘর্ষে ৭৭ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪০ জন হামলাকারীদের গুলি ও আক্রমণে মারা গেছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সংঘাত বেড়েছে। এর সঙ্গে অবৈধ ও লুণ্ঠিত অস্ত্রের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় দেশের বিভিন্ন থানা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল। এসব অস্ত্রের একটি অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৩১১টি লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র এখনো নিখোঁজ রয়েছে। এর মধ্যে ১০৯টি চাইনিজ রাইফেল ও ৩০টি সাবমেশিনগান রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ২ লাখ ৫৭ হাজার ১২৫ রাউন্ড গুলিও নিখোঁজ। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি অংশ অপরাধী চক্র, মাদক কারবারি ও কিশোর গ্যাংয়ের হাতে পৌঁছে থাকতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় ৩০টি রুট দিয়ে বিদেশি পিস্তল ও রিভলবারসহ বিভিন্ন ধরনের অবৈধ অস্ত্র দেশে প্রবেশ করছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বর্তমানে ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে, সেগুলোতে ব্যবহৃত অস্ত্রের বড় অংশ অবৈধ অথবা লুণ্ঠিত অস্ত্র। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিভিন্ন থানা থেকে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল। এখনো প্রায় ১ হাজার ৩১০টি লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এসব অস্ত্র যতদিন মাঠপর্যায়ে থাকবে, ততদিন অপরাধীরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধে সেগুলো ব্যবহার করার সুযোগ পাবে।
তিনি বলেন, কোনো অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতা থাকলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক সময় দ্বিধায় পড়ে। অপরাধীদের মধ্যে যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব, তাহলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। গ্রেফতারের পরও বিভিন্ন আইনি ফাঁকফোকর বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর মাধ্যমে অপরাধীরা পার পেয়ে গেলে তাদের মধ্যে অপরাধ করার সাহস আরও বাড়ে।
পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও তৎপর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ। তার মতে, মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা দিতে হবে। একই সঙ্গে লুণ্ঠিত অস্ত্র দ্রুত উদ্ধার, অবৈধ অস্ত্রের উৎস শনাক্ত ও সরবরাহ বন্ধ, সংঘবদ্ধ ছিনতাই ও ডাকাত চক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা জরুরি।
অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সার্বিক পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অপরাধের পেছনের কারণ শনাক্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।
রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অস্ত্র উদ্ধারে তথ্য দিতে জনগণকে উৎসাহিত করতে পুরস্কার ঘোষণার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
এসআর