বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান,
বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমেদের মতো ব্যক্তিত্বরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রজন্মের কাছে অনুসরণীয় হয়ে ছিলেন।
একসময় তরুণদের কেউ শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকণ্ঠের বক্তৃতা অনুকরণ করতেন, কেউ ভাসানীর মতো নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখতেন। কেউ শেরে বাংলার নেতৃত্বের আদর্শ অনুসরণ করতে চাইতেন, কেউ ওসমানীর সামরিক পোশাকে অনুপ্রাণিত হতেন। আবার কেউ জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতা কিংবা মতিউর রহমানের মতো আকাশে উড়ার স্বপ্ন দেখতেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমেদের মতো মার্জিত ও প্রাঞ্জল ভাষায় কথা বলার আকাঙ্ক্ষাও ছিল অনেকের।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক প্রজন্মের একটি অংশের সেই আদর্শিক অবস্থানে যেন বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়।
একসময় যাদের অনুসরণ করা হতো, তাদের কেউ কেউ এখন ‘গাদ্দার’ হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছেন। আবার কারও নেতৃত্বকে বর্তমান সময়ের সঙ্গে ‘অ্যাডাপ্ট’ না করার যুক্তিতে পুরোনো সংস্করণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এর বিপরীতে নতুন প্রজন্মের একটি অংশ আদর্শ ও অনুকরণের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছে শরীফ উসমান হাদিকে!
বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বক্তব্যেও উসমান হাদিকে অনুসরণ করার আহ্বান কিংবা তাঁর আদর্শ ধরে রাখার কথা উঠে এসেছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা ও আদর্শ নিয়ে প্রশংসা করেছেন। ড. ইউনূস, হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমের বক্তব্যেও উসমান হাদির আদর্শ হারিয়ে যেতে না দেওয়ার কথা উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে উসমান হাদিকে ঘিরে আলোচনার পাশাপাশি তাঁর বক্তব্যের ভাষা নিয়েও চরম বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন বক্তব্যে প্রতিপক্ষকে আক্রমণাত্মক এবং অশালীন ভাষা ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
সমর্থকদের কাছে এই ভাষা হয়তো ছিল প্রতিবাদের একটি ধরন; কিন্তু সমালোচকদের কাছে তা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আর সেই জায়গাতেই সামনে এসেছে সাম্প্রতিক সিফাত প্রসঙ্গ।
উসমান হাদির অনুসারী হিসেবে পরিচিত সিফাত নামের এক তরুণ সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে চরম অবমাননাকর গালাগালি করে বক্তব্য দেন। বক্তব্য নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় এবং পরবর্তীতে সিফাতকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—সিফাতের ভাষা যদি অগ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে একই ধরনের আক্রমণাত্মক ভাষার রাজনৈতিক চর্চা যখন উসমান হাদির বক্তব্যে দেখা গেছে, তখন সেটি কীভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে?
দুজনের ক্ষেত্রেই যদি রাজনৈতিক বক্তব্যে গালাগালি ও ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রবণতা থাকে, তাহলে বিষয়টি ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যের প্রশ্ন না করে রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন হিসেবেই দেখা উচিত।
অথচ এখন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে একজনের বক্তব্যকে ‘আদর্শিক প্রতিবাদ’ বলা হচ্ছে, আর অন্যজনের একই ধরনের ভাষাকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে—এখানেই তৈরি হচ্ছে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ।
যে রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে একসময় নতুন প্রজন্মের আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলো, সেই সংস্কৃতির ভাষা অনুসরণ করলেই যদি শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে দায়টা শুধু সিফাতের, নাকি সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও?
উসমান হাদির আদর্শ নিয়ে যারাই কথা বলেছেন, তাদের এখন নিজেদের কাছেই প্রশ্ন করা উচিত—আদর্শ কি শুধু অনুসরণ করার জন্য, নাকি আদর্শের ভাষা ও আচরণের দায়ও নিতে হবে?
রাজনীতিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকতে হবে। একই সঙ্গে গালাগালি, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষার ক্ষেত্রেও একই আইন ও একই মানদণ্ড সবার জন্য প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
কারণ, একজনের গালাগালি যদি বিপ্লবী ভাষা হয়, আর অন্যজনের গালাগালি যদি অপরাধ হয়—তাহলে সমস্যাটা শুধু গালাগালিতে নয়, সমস্যাটা মানদণ্ডের বৈষম্যে।
এসআর