★ জিরো টলারেন্সে অনিয়ম-দুর্নীতি ★ এখন আর ফাইল আটকে থাকে না ★ কমছে হয়রানি
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি বাড়ার পাশাপাশি সেবা প্রত্যাশীদের হয়রানিও কমেছে।
বদলি, গ্রেড পরিবর্তন, পেনশনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আবেদনের নিষ্পত্তি আগের তুলনায় দ্রুত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি মাউশিকে আরও গতিশীল, জবাবদিহিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।
জানা যায়, ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল মাউশির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল।
দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী মাউশির প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনা, ফাইলের দীর্ঘসূত্রতা কমানো, অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সেবা প্রত্যাশীদের হয়রানি বন্ধে একাধিক উদ্যোগ নেন তিনি।
একই সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মাউশি সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চালু করা হয়েছে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা।
নথি উপস্থাপনে ধীরগতি কমানো, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও কার্যক্রম সহজীকরণসহ প্রশাসনিক বিভিন্ন ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, এর ফলে সেবা নিতে আসা শিক্ষক-কর্মচারীদের ভোগান্তি আগের তুলনায় কমেছে।
এর একটি উদাহরণ নওয়াব হাবীবুল্লাহ কলেজের অধ্যক্ষ মো. শাহিনুর মিয়া। তিনি মাউশিতে গ্রেড পরিবর্তনের জন্য আবেদন করে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই তা নিষ্পত্তি করিয়েছেন।
শাহিনুর মিয়া প্রতিদিনের বাংলাকে বলেন, ‘সত্যিই খুব ভালো লাগছে। আমার কাজটি এত দ্রুত হবে ভাবতে পারিনি।’
কারমাইকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম মাউশিতে পেনশনের কাগজপত্র জমা দেন।
স্বল্প সময়ের মধ্যেই তার আবেদন নিষ্পত্তি হয়। তিনি বলেন, ‘আবেদনে সাড়া দিয়ে মাউশি আমার কাজ শেষ করেছে।’
অন্যদিকে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. শাহ জালাল তার বাড়ির কাছাকাছি উপজেলা বুড়িচংয়ে বদলির জন্য মাউশিতে আবেদন করেন। পরে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলি হন। এ ক্ষেত্রে তাকে কোনো ধরনের তদবির করতে বা অর্থ ব্যয় করতে হয়নি।
একসময় মাউশি সম্পর্কে প্রচলিত ছিল ‘টাকা ছাড়া এখানে কোনো কাজ হয় না।’
দীর্ঘদিনের এই বদনাম ঘোচাতে বদ্ধপরিকর বর্তমান মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
শুধু কয়েকজন সেবা প্রত্যাশীর অভিজ্ঞতা নয়, মাউশির সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তনের দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বদলি-বাণিজ্য বন্ধ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং সেবা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা কমানোর বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
কেবল তাই নয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের নির্যাতন বন্ধে নেয়া হয়েছে উদ্যোগ। শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারীদের ফেসবুক চালনায় ও দেয়া হয়েছে কঠোর নির্দেশনা।
এ ছাড়া মাউশির আওতাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবা সহায়তা, প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন এবং শিক্ষক দিবস পালনের মতো কার্যক্রমও নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনিক সংস্কারের এসব উদ্যোগের সুফল ধীরে ধীরে সেবা প্রত্যাশীদের কাছে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
★ এখন আর ফাইল আটকে থাকে না-
মাউশির প্রশাসনিক কার্যক্রমে ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাউশির উপপরিচালক (প্রশাসন) শামীম আল মামুন প্রতিদিনের বাংলাকে বলেন, ‘দেখুন, আমার দপ্তরে কোনো কোন ফাইল আটকে নেই। আমার দপ্তরে যে কোনো ফাইল আসলে দ্রুততম সময়ে স্বাক্ষর করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ডিজি স্যারের কড়া নির্দেশ- কোনো ফাইল আটকানো বা ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। এতে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীসহ সেবা প্রত্যাশীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।’
মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক মো: সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, আমরা একজন ডাইনামিক ডিজি পেয়েছি। তিনি সব সময় শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
স্যার দায়িত্ব নেয়ার পর স্টার্ট আপ সাইন্স প্রজেক্ট ইনোভেশন আইডিয়া এন্ড শোকেজিং প্রোগ্রাম সফলতার সাথে উদযাপন করেন।
যা বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাজে লাগবে। এছাড়াও পেনশনের টাকার সংস্থানের লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশি, অবসর সুবিধা বোর্ড , বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ পরিষদের সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে শিক্ষকদের পেনশনের সংকট সমাধান করেন। যা শিক্ষক কর্মকর্তা, কর্মচারীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।
মহাপরিচালকের দিক নির্দেশনায় বর্তমানে কাজের গতি বাড়ছে। হয়রানি ও কমেছে বলে মন্তব্য করেন মাধ্যমিক শাখার এই কর্মকর্তা।
মাউশির কর্মকর্তাদের মতে, কোনো ফাইল অযথা একটি পর্যায়ে পড়ে থাকলে তার প্রভাব সরাসরি সেবা প্রত্যাশীর ওপর পড়ে।
এ কারণে নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট পর্যায়েই দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়ও কমানোর চেষ্টা চলছে।
মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আমার প্রধান লক্ষ্য ছিল মাউশিকে আরও গতিশীল, জবাবদিহিমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং জনবান্ধব একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।’
তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে বিভিন্ন উইংয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়েছে।পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যথাসম্ভব নিচের পর্যায়ে অর্পণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে পরিচালক ও উপপরিচালক পর্যায়ে অনেক নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয় দ্রুত সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং সেবাপ্রদানের গতি বেড়েছে।
★ জিরো টলারেন্সে অনিয়ম-দুর্নীতি
অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানিয়েছেন মাউশির মহাপরিচালক। তিনি প্রতিদিনের বাংলাকে বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি। বদলি-বাণিজ্য বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের তদবিরের পরিবর্তে নিয়ম অনুযায়ী বদলি কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘মাউশিতে সেবা নিতে এসে শিক্ষক-কর্মচারীরা যাতে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
★ ১৮ প্রকল্পের ধারণাপত্র তিন দিনে
দায়িত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘদিনের একটি ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ হিসেবে মাত্র তিন দিনের মধ্যে ১৮টি প্রকল্পের ধারণাপত্র প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান মহাপরিচালক।
তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দীর্ঘদিনের একটি বড় ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ হিসেবে মাত্র তিন দিনের মধ্যে ১৮টি প্রকল্পের ধারণাপত্র প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করি।’
এ ছাড়া প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ রিসোর্সপুল গঠন, পত্র গ্রহণ শাখার ডিজিটালাইজেশন, ইএমআইএস আধুনিকায়ন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মহাপরিচালক বলেন, ‘সবকিছু একসঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তবে আমার প্রত্যাশা ছিল একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা। সেই ভিত্তি তৈরির কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়েছে। এখন মূল লক্ষ্য হচ্ছে এসব উদ্যোগকে টেকসই ও কার্যকর ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া।’
জানা গেছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অধ্যাপক ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলকে মাউশির মাধ্যমিক বিভাগের পরিচালক করা হয়।
পরে তিনি শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ওই পদ থেকে সরে এসে মাউশির মহাপরিচালকের দায়িত্ব নেন। ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল তিনি মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
★ সেবা পাচ্ছেন লাখো শিক্ষক-কর্মচারী
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশের প্রায় ৩৩ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ৫ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারীর দেখভালের দায়িত্ব মাউশির।
প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী বদলি, পেনশন, গ্রেড পরিবর্তনসহ নানা প্রশাসনিক সেবা নিতে মাউশিতে আসেন।
বর্তমানে এসব সেবার বড় একটি অংশ তুলনামূলক দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, দায়িত্বের বিকেন্দ্রীকরণ এবং ফাইল নিষ্পত্তিতে নজরদারি বাড়ানোর ফলে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলেও মনে করছেন তারা।
তবে মাউশির কার্যক্রমে এখনও জনবল সংকটকে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসআর