দেশের শীর্ষ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের (স্বপ্ন) জনসংযোগ বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে চলা কথিত ‘গুপ্ত কমিশন সিন্ডিকেট’-এর ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে প্রতিদিনের বাংলার অনুসন্ধানে।
অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন কর্মকর্তা বিজ্ঞাপন বরাদ্দের নামে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা কমিশন আদায় করেছেন।
সম্প্রতি সিন্ডিকেটের মূল সমন্বয়ক হিসেবে অভিযুক্ত এক কর্মকর্তার হঠাৎ নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনায় সামনে আসে বহু বছরের এই অনিয়মের চিত্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের (স্বপ্ন) মিডিয়া অ্যান্ড পিআর বিভাগের সাবেক ম্যানেজার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলুর নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র গত প্রায় ছয় বছর ধরে দেশের শতাধিক সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার প্রতিনিধিদের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন দেয়ার শর্তে অগ্রিম কমিশন গ্রহণ করতো। অভিযোগ রয়েছে, বিজ্ঞাপনের বাজেট যত বড় হতো, কমিশনের অঙ্কও তত বাড়তো।
অগ্রিম কমিশন ছাড়া মিলতো না বিজ্ঞাপন
ভুক্তভোগী একাধিক গণমাধ্যম প্রতিনিধি ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিক প্রতিদিনের বাংলাকে জানিয়েছেন, স্বপ্ন’র বিজ্ঞাপন পেতে হলে আগে থেকেই ‘পার্সেন্টেজ’ দিতে হতো। প্রতি লাখ টাকার বিজ্ঞাপনের বিপরীতে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন নেয়া ছিল অনেকটা অলিখিত নিয়ম।
তাদের দাবি, কমিশনের টাকা নগদ, বিকাশ, নগদ অ্যাকাউন্ট কিংবা ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে নেয়া হতো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কার্যাদেশ দেয়ার আগেই কমিশনের টাকা পরিশোধ করতে হতো। বিনিময়ে স্বপ্ন’র প্যাডে স্বাক্ষরিত ওয়ার্ক অর্ডার পাঠাতেন কামরুজ্জামান মিলু। কখনও সরাসরি, কখনও ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠানো হতো বিজ্ঞাপনের কার্যাদেশ।
অনেক গণমাধ্যম মালিক জানিয়েছেন, বছরের পর বছর একই প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ ও বিল উত্তোলন হওয়ায় বিষয়টিকে তারা প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার অংশ বলেই মনে করেছিলেন।
৫ কোটি টাকা হাতিয়ে ‘উধাও’!
অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের শুরুতে বছরব্যাপী বিজ্ঞাপন ক্যাম্পেইনের নামে নতুন করে বড় অঙ্কের বিজ্ঞাপনের প্রস্তাব দেয়া হয় বিভিন্ন গণমাধ্যম ও এজেন্সিকে। আর সেই সুযোগেই কয়েক কোটি টাকার অগ্রিম কমিশন সংগ্রহ করা হয়।তবে গত ৮ মার্চ হঠাৎ করেই মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলু কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। এরপরই ভুক্তভোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তার ব্যবহৃত একাধিক মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপেও কোনো সাড়া মেলেনি।
পরবর্তীতে বিভিন্ন সূত্রে খবর ছড়িয়ে পড়ে, প্রায় ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে দেশ ছেড়েছেন তিনি। এরপর একের পর এক ভুক্তভোগী এসিআই’র তেজগাঁও কার্যালয়ে যোগাযোগ শুরু করেন।
‘দায় নেবে না এসিআই’
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিষয়টি জানাতে এসিআই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে।
একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের মালিক প্রতিদিনের বাংলাকে বলেন, “আমার সঙ্গে এক বছরের বিজ্ঞাপন চুক্তি হয়েছিল। ছয় লাখ টাকার কার্যাদেশের বিপরীতে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা কমিশন দিয়েছি। এখন বিজ্ঞাপনের বিলও পাচ্ছি না, কমিশনের টাকাও গেল।”
আরেক গণমাধ্যম মালিক জানান, ১৬ লাখ টাকার বিজ্ঞাপনের আশ্বাসে তিনি প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা অগ্রিম কমিশন দেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানের কয়েক লাখ টাকার বিলও বকেয়া রয়েছে।
একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার মালিকের দাবি, ৩৬ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন কার্যাদেশের বিপরীতে তার কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা কমিশন নেয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, বর্তমানে বকেয়া বিল পরিশোধের ক্ষেত্রেও নতুন করে ‘ম্যানেজমেন্ট খরচ’ বা কমিশনের প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। যারা রাজি হচ্ছেন, তারা আংশিক বিল বা নতুন বিজ্ঞাপন পাচ্ছেন। আর আপত্তি তুললেই নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে।
সিইওর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুধুমাত্র একজন কর্মকর্তার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে এমন বিশাল কমিশন বাণিজ্য পরিচালনা করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ের নীরব সমর্থন কিংবা প্রশ্রয় ছাড়া এই সিন্ডিকেট এত শক্তিশালী হতে পারতো না।
অভিযোগ উঠেছে এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সাব্বির হাসান নাসিরের বিরুদ্ধেও। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, কামরুজ্জামান মিলু ছিলেন তার ঘনিষ্ঠজন এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যথেষ্ট প্রভাবশালী।
তবে সিইও বা শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। তাদের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কমিটি গঠন
ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেড (স্বপ্ন) একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত ৮ মার্চ ই-মেইলের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর ছাড়াই নিখোঁজ হন কামরুজ্জামান মিলু। পরবর্তীতে তার দায়িত্বকালীন সময়ে আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ ওঠায় তদন্ত শুরু করা হয়েছে এবং তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তবে ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন— বছরের পর বছর ধরে চলা এই কমিশন বাণিজ্যের দায় কি শুধুই একজন কর্মকর্তার?
আরও বড় সিন্ডিকেটের অভিযোগ
স্বপ্ন’র একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র প্রতিদিনের বাংলাকে জানিয়েছে, শুধু জনসংযোগ বিভাগ নয়; প্রতিষ্ঠানটির আরও কয়েকটি বিভাগেও কমিশনভিত্তিক সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে ভেন্ডর, সরবরাহকারী ও ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিনের।
সূত্রগুলোর দাবি, এসব অনিয়মের প্রভাব পড়ছে পণ্যের গুণগত মান ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও। দেশের বিভিন্ন আউটলেটে নিম্নমানের মাছ, মাংস, ফল ও সবজি নিয়ে ক্রেতাদের অভিযোগ প্রায়ই দেখা যায়।
বিষয়টি নিয়ে প্রতিদিনের বাংলার অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
এসআর