বিশ্ব উষ্ণায়নের ঝুঁকি বাড়ছে, এখনই পদক্ষেপের আহ্বান জাতিসংঘ মহাসচিবের। বিশ্ব যখন একের পর এক তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি, তখন নতুন করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি এখন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা। গত ১১ বছর ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানবজীবনের ওপর এর প্রভাব আরও গভীর হবে।
গুতেরেস বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ক্ষতি শুধু তাপমাত্রা বাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বায়ুদূষণ, ভূমির অবক্ষয়, বনাঞ্চল ধ্বংস, প্রতিবেশ ব্যবস্থার ভাঙন এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন সংকট তৈরি করছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, আবাসন এবং জীবিকার ওপর।
জাতিসংঘ মহাসচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ব সাময়িকভাবে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতার সীমা অতিক্রমের পথে রয়েছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, এই সীমা অতিক্রম করলে চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রতিটি অংশই নতুন ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, আর এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় ঝুঁকিপূর্ণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ দ্রুত কমানোর ওপর জোর দেন গুতেরেস। তিনি বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া এখন সময়ের দাবি। সৌর ও বায়ুশক্তির মতো পরিচ্ছন্ন জ্বালানি শুধু পরিবেশবান্ধব নয়, দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক।
তিনি আরও বলেন, মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ কমানো বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর ও তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল উপায়। তাই দেশগুলোকে এ বিষয়ে আরও সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবে।
পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বন, ভূমি ও সমুদ্রের গুরুত্ব তুলে ধরেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তিনি বলেন, বনভূমি পৃথিবীর প্রাকৃতিক কার্বন শোষণ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উপাদান। একইভাবে সমুদ্র জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে দূষণ, বন উজাড়, অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পরিবেশ রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
গুতেরেস উন্নত দেশগুলোর প্রতি জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা করা জরুরি। কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী দেশগুলোই অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে।
তার মতে, জলবায়ু অর্থায়ন শুধু পরিবেশ রক্ষার বিষয় নয়; এটি জীবন ও জীবিকা সুরক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা, টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার সঙ্গেও জড়িত।
বাংলাদেশের জন্য বার্তার তাৎপর্য করে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো সমস্যার কারণে দেশের লাখো মানুষ সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, বনায়ন কর্মসূচি জোরদার করা, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং জলবায়ু অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। আমাদের পরিবেশের জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তার এই বার্তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়; বরং ক্রমবর্ধমান জলবায়ু সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বিশ্ববাসীর প্রতি একটি জরুরি সতর্কবার্তা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান।
এসআর