[email protected] শনিবার, ১৬ মে ২০২৬
২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

উষ্ণ পৃথিবীর দিকে এগোচ্ছে বিশ্ব, চাপে জাতিসংঘের COP আলোচনা

মোঃ আলী আকবর রনী

প্রকাশিত: ২৩ নভেম্বর ২০২৪ ১২:০৩ পিএম

তিন বছরেও কমেনি বৈশ্বিক উষ্ণতার ঝুঁকি, চাপে জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনা। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একের পর এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও প্রতিশ্রুতি এলেও কমছে না বৈশ্বিক উষ্ণতার ঝুঁকি।

বিগত টানা তিন বছর ধরে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির পূর্বাভাস একই অবস্থানে আটকে আছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমান নীতিমালা অব্যাহত থাকলে পৃথিবী এখনও প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় প্রায় ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ হওয়ার পথেই রয়েছে।

আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে চলমান জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন COP29-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জলবায়ু নীতি ও কার্বন নিঃসরণ নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট অ্যাকশন ট্র্যাকার (CAT) এ বিশ্লেষণ প্রকাশ করে।

বিশ্ব ইতোমধ্যে প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় প্রায় ১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণ হয়ে গেছে। ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তিতে দেশগুলো বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য ক্রমেই অধরা হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্লেষণে বলা হয়, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ এখনও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে খরা, বন্যা, তাপপ্রবাহ, দাবানল ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে।

ক্লাইমেট অ্যানালিটিক্সের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ার বলেন, “জলবায়ু সম্মেলনগুলো থেকে অনেক ইতিবাচক বার্তা আসছে, কিন্তু বাস্তবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকটা ভেঙে পড়ার মতো মনে হচ্ছে।”

পাকিস্তানের সিনেটের জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান শেরি রহমান বলেন, “২৯ বছর ধরে জলবায়ু আলোচনা চলছে, কিন্তু আমরা এখনও শুধু স্লোগান নিয়েই কথা বলছি। এখন প্রয়োজন বাস্তব ও রূপান্তরমূলক পদক্ষেপ।”

সম্মেলনের অন্যতম বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে জলবায়ু অর্থায়ন। উন্নয়নশীল দেশগুলো বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য বিপুল অর্থ সহায়তা প্রয়োজন।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের নিয়োগ দেওয়া স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল জানিয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বছরে অন্তত ১ ট্রিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের প্রতিশ্রুত অর্থের তুলনায় এটি প্রায় তিনগুণ বেশি।

তবে এই অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং ধনী দেশগুলো কতটা দায়িত্ব নেবে, তা নিয়ে ধনী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলোচক ভেরোনিকা বাগি বলেন, আলোচনা আগের চেয়ে আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এক বছরের আলোচনায় তৈরি করা কয়েক পৃষ্ঠার খসড়া বাতিল হওয়ার পর নতুন প্রস্তাব ৩০ পৃষ্ঠার বেশি হয়ে গেছে।

জার্মানির জলবায়ুবিষয়ক দূত জেনিফার মরগান বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর চাহিদা পূরণে বেসরকারি বিনিয়োগকে সামনে আনতে হবে। তবে খ্রিস্টিয়ান এইডের কর্মকর্তা মারিয়ানা পাওলি বলেন, “যদি অর্থায়ন সরকারি অনুদানভিত্তিক না হয়, তাহলে সেটি অর্থবহ হবে না। বেসরকারি খাত লাভের জায়গা দেখবে, মানুষের প্রয়োজন নয়।”

তিনি আরও বলেন, “এটি শুধু অর্থের প্রশ্ন নয়, এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।” 

মেক্সিকোর জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ সান্দ্রা লেটিসিয়া গুজমান লুনা বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি মানুষের জীবনহানির কারণও হচ্ছে।”

এদিকে, সম্মেলনের মধ্যেই রাজনৈতিক টানাপোড়েনও দেখা দিয়েছে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সরকারের নির্দেশে দেশটির প্রতিনিধিদল সম্মেলন থেকে সরে যায়। জলবায়ু কর্মীরা এ সিদ্ধান্তকে হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেছেন।

অন্যদিকে, আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ ইউরোপের ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়ে মন্তব্য করায় ফ্রান্সের পরিবেশমন্ত্রী সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জীবাশ্ম জ্বালানির প্রভাবের কারণে জলবায়ু আলোচনা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না। অথচ সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, বর্তমান গতিতে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, পানি, উপকূলীয় অঞ্চল ও বৈশ্বিক অর্থনীতি ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে।

 

এসআর

সম্পর্কিত খবর