জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় তেল, গ্যাস ও কয়লার ব্যবহার কমাতে নতুন বৈশ্বিক উদ্যোগ শুরু হয়েছে। ৫০টির বেশি দেশকে সঙ্গে নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান প্যানেল বিভিন্ন দেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক রূপান্তর পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করবে।
তেল, গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বিশ্বের দেশগুলোকে এগিয়ে নিতে নতুন একটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান প্যানেল গঠন করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, জ্বালানি নিরাপত্তা, উচ্চ তেলের দাম ও ভূরাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় দেশগুলোকে বৈজ্ঞানিক ও নীতিগত সহায়তা দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কলম্বিয়ার সান্তা মার্তায় অনুষ্ঠিত জলবায়ু কার্যক্রমবিষয়ক এক বৈশ্বিক সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে এই উদ্যোগ ঘোষণা করা হয়। ২৪ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ৫০টির বেশি দেশ, বিভিন্ন আঞ্চলিক সরকার এবং প্রায় ২ হাজার ৮০০ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি অংশ নেন। সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ধাপে ধাপে সরে এসে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর গতি বাড়ানো।
নতুন এই বিজ্ঞান প্যানেলে জলবায়ু, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা যুক্ত হয়েছেন। তারা বিভিন্ন দেশের জন্য বাস্তবভিত্তিক জ্বালানি রূপান্তর পরিকল্পনা বা রোডম্যাপ তৈরিতে সহায়তা করবেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হলে দ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো ছাড়া বিকল্প নেই। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই প্যানেলটি বিভিন্ন দেশের জন্য জাতীয় ও খাতভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণে কাজ করবে।
প্যানেলটির নেতৃত্বে রয়েছেন ক্যামেরুনের অর্থনীতিবিদ ভেরা সংওয়ে, জার্মানির জলবায়ু অর্থনীতিবিদ অটমার ইডেনহোফার এবং ব্রাজিলের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জিলবার্তো জানুজ্জি।
জানুজ্জি বলেন, “প্রযুক্তিগতভাবে জ্বালানি রূপান্তর সম্ভব। মূল চ্যালেঞ্জ হলো তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা।” এই উদ্যোগটি এমন সময় নেওয়া হলো, যখন বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনা ক্রমেই জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসার বাস্তব পরিকল্পনার দিকে জোর দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়া জলবায়ু লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
সম্মেলনে উপস্থাপিত এক খসড়া পরিকল্পনায় বলা হয়, যদি ২০৫০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ৯০ শতাংশ কমানো যায়, তাহলে একই সঙ্গে জ্বালানি চাহিদা পূরণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা সম্ভব হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরের মাধ্যমে আগামী ২৪ বছরে প্রায় ২৮০ বিলিয়ন ডলারের সরাসরি অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। যদিও শুরুতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে, তবে ২০৪০ সালের পর থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভ বাড়তে শুরু করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ শুধু জলবায়ু সুরক্ষাই নয়, দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সম্মেলনে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে নাইজেরিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও অ্যাঙ্গোলার মতো বড় জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশও রয়েছে। এসব দেশের জন্য তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসা বড় চ্যালেঞ্জ হলেও, বিজ্ঞানীরা মনে করছেন ধীরে ধীরে পরিকল্পিত রূপান্তর সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, প্রতিটি দেশের বাস্তবতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভিন্ন। তাই দেশভিত্তিক জ্বালানি রূপান্তর পরিকল্পনা তৈরি করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
এসআর