[email protected] শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৬ ভাদ্র ১৪৩৩

নীরব জন্মদিনে পপির জীবনের নতুন উপলব্ধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:০১ পিএম

সংগৃহীত ছবি

একসময় জন্মদিন এলেই ব্যস্ত হয়ে উঠত চিত্রনায়িকা সাদিকা পারভীন পপির বাসা।

ভক্তদের শুভেচ্ছা, কেক কাটা, ফুল আর ফ্যান ক্লাবের আয়োজন—সব মিলিয়ে দিনটি পরিণত হতো আনন্দের উৎসবে। কখনো আবার শুটিং সেটেই জন্মদিন কাটিয়েছেন তিনি।

তবে দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রের আলো থেকে দূরে থাকা পপির এবারের জন্মদিনও কাটছে সাদামাটাভাবেই।

 

অভিনেত্রীর ভাষ্য, আগের মতো আয়োজন এখন আর নেই। তবে দিনটি একেবারে অনাড়ম্বর হলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভিন্ন ধরনের কিছু উদ্যোগ। জন্মদিন উপলক্ষে কয়েকটি এতিমখানায় কোরআন খতম ও খাবারের ব্যবস্থা করেন তিনি। ফলে উৎসবের পরিবর্তে প্রার্থনা, পরিবার ও নিজের জীবন নিয়ে ভাবনাই যেন দিনটির প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।

 

জীবনের নানা অভিজ্ঞতা থেকে পপি যে উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন, তার একটি দিকও উঠে এসেছে সাম্প্রতিক বক্তব্যে। তার মতে, পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে হলেও নিজের অবস্থান শক্ত না করে সবকিছু বিলিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। একসময় সবাইকে নিজের মনে করলেও পরে অনেক সম্পর্কের বাস্তবতা বদলে গেছে—এমন আক্ষেপও প্রকাশ করেছেন তিনি।

 

তারকাখ্যাতি থেকে দীর্ঘ আড়াল

১৯৯৭ সালে ‘কুলি’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় পপির। এরপর বাণিজ্যিক ধারার একাধিক সিনেমায় অভিনয় করে ঢালিউডে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও।

 

একসময় শুটিং, প্রচারণা, পুরস্কার আর দর্শকের ভালোবাসায় নিয়মিত ব্যস্ত থাকা এই অভিনেত্রী হঠাৎ করেই আড়ালে চলে যান। প্রায় পাঁচ বছর ধরে তাকে নিয়মিতভাবে গণমাধ্যমের সামনে দেখা যায়নি। তার অনুপস্থিতি ঘিরে নানা আলোচনা থাকলেও পরে ব্যক্তিজীবন নিয়ে কিছু তথ্য সামনে আসে।

 

জানা যায়, পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী আদনান উদ্দিন কামালের সঙ্গে পপির বিয়ে হয়েছে। তাদের একটি ছেলে সন্তানও রয়েছে। বর্তমানে সংসার ও সন্তানকে ঘিরেই তার জীবনের বড় একটি অংশ কাটছে।

 

পারিবারিক বিরোধে প্রকাশ্যে আসে নানা অভিযোগ

দীর্ঘ নীরবতার মধ্যে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কারণে আবারও আলোচনায় আসেন পপি। খুলনায় বাবার সম্পত্তি নিয়ে মা ও ভাই-বোনদের সঙ্গে তার বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। ছোট বোনের করা সাধারণ ডায়েরির সূত্র ধরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সেখানে পপির বিরুদ্ধে জমি দখল ও পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

 

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পপি। তার দাবি, নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে বাবার ও চাচার কাছ থেকে সম্পত্তি কিনেছেন তিনি। বরং পরিবারের সদস্যরা তার সম্পত্তি ভোগদখল করছেন এবং তাকে নিজের জায়গায় যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এই অভিনেত্রী।

 

বিরোধের সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়ও যুক্ত হয়েছে। পপির অভিযোগ, পরিবারের পেছনে দীর্ঘদিন অর্থ ব্যয় করলেও তার উপার্জনের বড় একটি অংশ নিয়ে নেওয়া হয়েছে। এমনকি কয়েক কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি। তবে তার মা ও বোন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পপির বিরুদ্ধেই সম্পত্তি দখলের অভিযোগ তুলেছেন।

 

‘বেইমানি’র অভিজ্ঞতা ও বদলে যাওয়া ভাবনা

২০২৫ সালে এক ভিডিও বার্তায় পপি বলেছিলেন, জীবনের উপার্জন দিয়ে যাদের মানুষ করেছেন, তাদের কাছ থেকেই তিনি বেইমানির শিকার হয়েছেন। পরিবারের জন্য দীর্ঘদিন অনেক কিছু করেও শেষ পর্যন্ত তাদের বিরোধিতার মুখে পড়েছেন—এমন কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

 

সম্প্রতি নিজের ভিত্তি শক্ত না করে সবকিছু বিলিয়ে না দেওয়ার যে কথা বলেছেন পপি, তার সঙ্গে অতীতের এই অভিজ্ঞতার মিল রয়েছে। তার জীবনদর্শনের এই পরিবর্তন কেবল সাধারণ কোনো উপলব্ধি নয়; সাম্প্রতিক পারিবারিক ঘটনাগুলোরও প্রতিফলন এতে দেখা যায়।

 

সিনেমাকে ‘পাপ’ বলার অভিযোগে ব্যাখ্যা

পপির একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারের বক্তব্য সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ফটোকার্ডে তার কথার অংশবিশেষ এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়কে ‘পাপ’ বলেছেন। এ নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা।

 

পরে পপি বিষয়টি পরিষ্কার করে জানান, তিনি কখনো সিনেমাকে পাপ বলেননি। তার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। চলচ্চিত্রকে নিজের পেশা ও দ্বিতীয় পরিবার হিসেবে উল্লেখ করে এই অভিনেত্রী বলেন, এই ইন্ডাস্ট্রি থেকেই তিনি উপার্জন করেছেন, পরিবার চালিয়েছেন এবং পেয়েছেন সম্মান ও দর্শকের ভালোবাসা।

 

অভিনয় থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার ঘোষণাও দেননি পপি। সম্প্রতি প্রযোজনায় কাজ করার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন তিনি। অভিনয়ে ফিরবেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু না বললেও চলচ্চিত্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক যে পুরোপুরি শেষ হয়নি, তা তার বক্তব্যে স্পষ্ট।

 

ফেরার অপেক্ষায় কি পুরোনো পপি?

পপির ক্যারিয়ার এখন যেন দুই ভিন্ন অধ্যায়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে তারকাখ্যাতির উজ্জ্বল সময়, অসংখ্য সিনেমা ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের স্বীকৃতি। অন্যদিকে রয়েছে দীর্ঘ আড়াল, সংসার, সন্তান, পারিবারিক বিরোধ এবং তাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা আলোচনা।

 

তবে চলচ্চিত্রকে পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছেন—এমন অবস্থানও নেননি তিনি। বরং জীবনের প্রয়োজনে দূরে থাকলেও অতীতের দিনগুলো মিস করেন বলে জানিয়েছেন। তাই ভবিষ্যতে অভিনয়ে ফিরবেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত।

পপির এবারের জন্মদিন তাই শুধু একজন তারকার জন্মদিনের আয়োজন নয়। এটি তার জীবনের পরিবর্তন, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং নতুন করে নিজের মতো করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষারও প্রতিচ্ছবি। একসময় যে দিনটি ছিল ভক্তদের ভালোবাসায় ভরা, এখন সেই দিনেই তিনি খুঁজছেন শান্তি, পরিবার ও নিজের জন্য কিছুটা সময়।

এসআর

সম্পর্কিত খবর