[email protected] সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
১ আষাঢ় ১৪৩৩

ডিজিটাল বিভ্রান্তির যুগে বই ও মননের সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ মার্চ ২০২৬ ৮:৩১ এএম

সংগৃহীত ছবি

মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে জ্ঞানের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বাহন ছিল বই।

যুগে যুগে নবজাগরণ, দর্শনচর্চা এবং চিন্তার বিকাশের পেছনে বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সময়ে সেই বইয়ের নীরব জগত থেকে অনেক মানুষ ধীরে ধীরে সরে গিয়ে পর্দাকেন্দ্রিক বিনোদনের দিকে ঝুঁকছে।


বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও, রিলস কিংবা অবিরাম স্ক্রল করার প্রবণতা মানুষের সময় ও মনোযোগের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। ফলে যে সময় একসময় পড়াশোনা, ভাবনা ও আত্মচিন্তার জন্য ব্যয় হতো, তার অনেকটাই এখন হারিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল ব্যস্ততায়।


প্রাচীন একটি সংস্কৃত প্রবাদে বলা হয়েছে—পুস্তক হলো জ্ঞানের ভাণ্ডার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবজাতির অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও চিন্তার ধারা বইয়ের পাতায় সংরক্ষিত হয়েছে। একটি বই পড়া মানে কেবল শব্দ পড়া নয়; বরং তা পাঠককে ভিন্ন এক সময়, ভিন্ন এক চিন্তার জগতে নিয়ে যায়।


দার্শনিক René Descartes একবার বলেছিলেন, ভালো বই পড়া মানে অতীতের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের সঙ্গে কথোপকথন করার মতো। অর্থাৎ বই পাঠ মানুষকে ইতিহাসের মহান মনীষীদের ভাবনার সঙ্গে সংযুক্ত করে।
কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম দ্রুত বিনোদনের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও মুহূর্তের আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু তা চিন্তার গভীরতা তৈরি করতে পারে না। বরং দীর্ঘমেয়াদে এটি মনোযোগের স্থায়িত্ব কমিয়ে দেয়।

 

 


বই পড়ার অভ্যাস মানুষের ভাষা ও চিন্তাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে। একটি উপন্যাস পাঠ করলে আমরা চরিত্রগুলোর অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত হই, দর্শনের বই আমাদের নতুন চিন্তার দ্বার খুলে দেয়, আর ইতিহাসের বই সভ্যতার উত্থান-পতনের ধারাবাহিকতা বুঝতে সাহায্য করে।


সংস্কৃত ভাষায় আরেকটি প্রবাদে বলা হয়েছে—বিদ্যা মানুষকে বিনয়ী করে, আর সেই বিনয় তাকে প্রকৃত যোগ্যতার পথে এগিয়ে নেয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের মন প্রায়ই দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। সেখানে গভীর মনন বা দীর্ঘ চিন্তার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম।


বাংলা সাহিত্যেও বহুবার বলা হয়েছে, বই মানুষকে আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মচিন্তার পথে নিয়ে যায়। পর্দার জগৎ মানুষকে বাইরের দিকে টেনে নেয়, কিন্তু বই মানুষকে নিজের ভেতরের জগৎকে বুঝতে সাহায্য করে।


এ কারণে বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তি ও মননের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। প্রযুক্তি আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অংশ হলেও সেটি যেন চিন্তার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়। প্রতিদিন অল্প সময় হলেও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুললে নতুন চিন্তার জগতে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়।


জ্ঞানের মূল্য চিরকাল অম্লান। আর সেই জ্ঞানের অন্যতম প্রধান উৎস বই। যে সমাজ বই থেকে দূরে সরে যায়, সে সমাজ ধীরে ধীরে নিজের বৌদ্ধিক শক্তিকেও দুর্বল করে ফেলে।
ডিজিটাল যুগের দ্রুত বিনোদনের ভিড়ে তাই মনে রাখা জরুরি—রিলস হয়তো কয়েক মুহূর্তের আনন্দ দেয়, কিন্তু বই মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে চিন্তা করার শক্তি দেয়। আর সেই চিন্তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মানবসভ্যতার অগ্রগতির আসল ভিত্তি।

এসআর

সম্পর্কিত খবর