রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকান বসালে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা দায়ের ও মালামাল জব্দ করা হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাপ্তাহিক ক্লিনিং ডে উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলাকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডে একযোগে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি সড়ক ও ফুটপাতের অবৈধ দখল অপসারণ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং নগরবাসীর মধ্যে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নগরবাসীর চলাচলে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা, যানজট কমানো এবং ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে অবৈধ হকার ও ভাসমান দোকানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে নিউমার্কেট এলাকার সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে আগামী সপ্তাহে আবারও উচ্ছেদ অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন ডিএসসিসি প্রশাসক।
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, রাজধানীর সড়কে যানজট, যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা এবং পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টির পেছনে অবৈধ হকার ও ভাসমান দোকানগুলোর ভূমিকা রয়েছে। এসব কারণে নগরবাসীকে প্রতিদিন নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। জনসাধারণের চলাচলের জন্য নির্ধারিত সড়ক ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনার কারণে পথচারীদের অনেক ক্ষেত্রে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ায়। এ পরিস্থিতি থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে সড়ক ও ফুটপাত দখলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, ডিএসসিসির নির্ধারিত নিয়মের বাইরে সড়ক কিংবা ফুটপাতে দোকান বসানো হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পাশাপাশি দোকানের মালামাল জব্দ করা হবে। অবৈধ দখলদারদের বারবার অনুরোধ করার পরিবর্তে এখন থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। জনসাধারণের চলাচলের পথ দখল করে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে মানবিকতার দোহাই দিয়ে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখলকে কেন্দ্র করে পথচারীদের ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ব্যস্ত সড়ক, বিপণিবিতান ও বাণিজ্যিক এলাকার ফুটপাত দখল হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের হাঁটাচলা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক জায়গায় ফুটপাত দিয়ে চলাচল করতে না পেরে পথচারীদের যানবাহন চলাচলের সড়কে নামতে হয়। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ে। ডিএসসিসি প্রশাসকের ঘোষিত পদক্ষেপের লক্ষ্য হচ্ছে এসব সমস্যা কমিয়ে সড়ক ও ফুটপাতের স্বাভাবিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।
নিউমার্কেট এলাকার সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার বিষয়ে আবদুস সালাম জানান, আগামী সপ্তাহেই সেখানে পুনরায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। সড়কে অবৈধভাবে কোনো হকার বসতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন। উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে জনসাধারণের চলাচলের জায়গা পুনরুদ্ধার এবং সড়কের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নিউমার্কেট রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা। সেখানে ক্রেতা, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। এ ধরনের এলাকায় সড়ক ও ফুটপাত দখল হয়ে গেলে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে চাপ তৈরি হয়। ফলে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি সড়ক ও ফুটপাত পুনরায় দখল হওয়া ঠেকাতে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ঘোষিত অভিযানের বিস্তারিত সময়সূচি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে ডিএসসিসি প্রশাসক আলাদা করে কোনো তথ্য দিয়েছেন কি না, তা মূল বক্তব্য বা বিজ্ঞপ্তি থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে রাজধানীতে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধেও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ডিএসসিসি প্রশাসক। তিনি জানান, কোথাও যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বাড়ির ছাদ, আঙিনা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র এবং অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ কারণে ব্যক্তিগত বাসস্থান থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণস্থল পর্যন্ত নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর নির্ভর না করে নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাসস্থান ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোথাও পানি জমে থাকলে তা অপসারণ করা, ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা এবং মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল নিয়মিত পরীক্ষা করার মাধ্যমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। ডিএসসিসির পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি এসব বিষয়ে নাগরিকদের সচেতন করতেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
রাজধানীর পরিবেশ রক্ষা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং যানজট নিরসনে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি সচেতনতামূলক র্যালি ও প্রচারণা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন আবদুস সালাম। নগরীর পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত স্থানের বাইরে ময়লা না ফেলা, যত্রতত্র বর্জ্য জমতে না দেওয়া এবং জনসাধারণের চলাচলের জায়গা দখল না করার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
মালিবাগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কার্যালয়ের সামনে থাকা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) স্থানান্তরের বিষয়েও বক্তব্য দেন ডিএসসিসি প্রশাসক। তিনি জানান, সিআইডি কর্তৃপক্ষের অনুরোধে জনস্বার্থে ওই এসটিএস সরিয়ে সেখানে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার জায়গাটি বিকল্প জনসেবামূলক কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে এসটিএস সরিয়ে নেওয়ার পর ওই এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য নতুন একটি এসটিএস নির্মাণের কাজ চলছে বলে জানান তিনি। চলতি অক্টোবর মাসের মধ্যেই নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন স্থাপনাটি চালু হলে ওই এলাকার বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পটির নির্মাণ অগ্রগতি ও চালুর নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
ক্লিনিং ডে উপলক্ষে আয়োজিত পরিচ্ছন্নতা অভিযানটি মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হয়ে শান্তিনগর, কাকরাইল ও নয়াপল্টন হয়ে ফকিরাপুলে গিয়ে শেষ হয়। অভিযানের বিভিন্ন পর্যায়ে ডিএসসিসি প্রশাসক সড়কের পাশে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ এবং অবৈধ দোকান সরানোর কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাজও তিনি দেখেন।
দিনব্যাপী এ কর্মসূচিতে সিটি করপোরেশনের নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধনকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন। বিভিন্ন ওয়ার্ডে মাইকিংয়ের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার বিষয়ে প্রচারণা চালানো হয়। পাশাপাশি সচেতনতামূলক র্যালির মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং পরিবেশ রক্ষায় নাগরিকদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
ডিএসসিসির এ কর্মসূচিতে একদিকে যেমন পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সড়ক ও ফুটপাতের অবৈধ দখল অপসারণের বিষয়টিও সামনে এসেছে। নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে অবৈধ দোকানের বিরুদ্ধে ঘোষিত আইনগত ব্যবস্থা এবং নিউমার্কেটে আসন্ন উচ্ছেদ অভিযান কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও চলাচল উপযোগী রাখতে সিটি করপোরেশনের নিয়মিত তদারকির পাশাপাশি নাগরিকদের সহযোগিতাও প্রয়োজন। সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে নগরবাসীর দৈনন্দিন ভোগান্তি কমানো এবং স্বাস্থ্যকর নগর পরিবেশ গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।
এসআর