রাজধানীর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬০ নম্বর ওয়ার্ডের বৃহত্তর পাটেরবাগ, মুক্তধারা, নুরপুর, স্মৃতিধারা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসসংকটে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন বাসিন্দারা। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ছয় মাস ধরে এলাকার বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাসের সরবরাহ নেই বা অত্যন্ত অপ্রতুল। অথচ নিয়মিত গ্যাসের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় দিন দিন এলাকাবাসীর মধ্যে চাপা ক্ষোভ বাড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় রোববার (৩০ আগস্ট) গ্যাসসংকটের স্থায়ী সমাধানের দাবিতে পাটেরবাগ এলাকার এবং আশেপাশের বাসিন্দারা প্রতিবাদ মিছিল করেন। পরে তারা রায়েরবাগে তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক কার্যালয়ে গিয়ে স্মারকলিপি ও গণস্বাক্ষর জমা দেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
‘বৃহত্তর পাটেরবাগ সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে বিভিন্ন বয়সী মানুষ অংশ নেন। তাদের হাতে থাকা ব্যানারে গ্যাস সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানানো হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চুলায় গ্যাস না থাকায় প্রতিদিন বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে একদিকে সংসারের ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে গ্যাসের স্বাভাবিক সেবা না পেলেও নিয়মিত বিল দিতে হচ্ছে। ফলে ক্ষোভ আরও তীব্র হচ্ছে।
চেষ্টা চলছে, তবু সমাধান নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যাসসংকট নিরসনে ঢাকা-৪ আসনের বিএনপি নেতা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তানভীর আহমেদ রবিন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে উদ্যোগ ও যোগাযোগের পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, কোনো এক অদৃশ্য কারণে গ্যাসসংকটের সমাধান আটকে আছে। তবে এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা হয়নি।
গ্যাসসংকটটি নতুন নয় বলে দাবি এলাকাবাসীর। তাদের ভাষ্য, গত বছর একই সমস্যা নিয়ে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তাদের বহনকারী গাড়িসহ একটি গাড়ি দুই দিন অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন।
পরে স্থানীয় প্রশাসন ও তিতাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলে এলাকাবাসী অবরোধ তুলে নেন। কিন্তু এরপরও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় আবারও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা।
ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে অনেক। গ্যাসসংকটকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, সমস্যা সমাধান কিংবা গ্যাসসংযোগ পাওয়ার কথা বলে তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী অর্থ দাবি করছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগটির স্বাধীন কোনো প্রমাণও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, গ্যাসের মূল লাইনে পানি ঢুকে যাওয়ার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। কেউ কেউ আবার ইচ্ছাকৃতভাবে মূল লাইনে পানি ঢুকিয়ে দেওয়ার অভিযোগও করছেন। তবে এ দাবিরও কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
তিতাসের পাইপলাইনে পানি ঢুকে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঘটনা অবশ্য বিভিন্ন এলাকায় আগে ঘটেছে। জরাজীর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনের ছিদ্র দিয়ে পানি প্রবেশের কারণে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ঘটনাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
‘গ্যাস নেই, বিল কেন?’ এলাকাবাসীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যে সেবা তারা নিয়মিত পাচ্ছেন না, সেই সেবার বিল কেন নিয়মিত পরিশোধ করতে হবে?
তাদের দাবি, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিল সমন্বয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংকটের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে দ্রুত স্থায়ী সমাধান করতে হবে।
বাসিন্দারা বলেন, দিনের পর দিন গ্যাস না থাকার কারণে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে একাধিকবার যোগাযোগ ও আন্দোলন করেও কার্যকর ফল না পাওয়ায় মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।
এলাকাবাসীর দাবি, তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ দ্রুত সরেজমিনে তদন্ত করে ৬০ নম্বর ওয়ার্ডের গ্যাসসংকটের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করবে এবং দ্রুত স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে ঘুষ, অবৈধ সংযোগ কিংবা পাইপলাইনে পানি প্রবেশের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
এসআর