[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩

সব নথি বৈধ, তবুও পাসপোর্ট কর্মকর্তার হয়রানি; ক্ষোভে ফুঁসছে নেটদুনিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২ জুলাই ২০২৬ ৫:০৯ পিএম

ইনসেটে কর্মকর্তা মোঃ আবজাউল আলম

সব ধরনের বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও সাধারণ নাগরিকেরা কীভাবে সরকারি দপ্তরে হয়রানি ও দুর্নীতির শিকার হন, তার এক চরম বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে টাঙ্গাইল আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, এক নারী গ্রাহকের সমস্ত নথিপত্র ঠিক থাকার পরও শুধুমাত্র অতিরিক্ত অর্থ বা অনৈতিক সুবিধা (ঘুষ) না দেওয়ায় তাঁকে দিনের পর দিন ঘুরিয়ে অদ্ভুত অজুহাতে হয়রানি করছেন এক পাসপোর্ট কর্মকর্তা।

ভাইরাল হওয়া এই ঘটনার পর থেকে নেটিজেনরা ওই কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতি এবং তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলছেন।  ভাইরাল হওয়া ঐ কর্মকর্তা হলে, মোঃ আবজাউল আলম, সহকারী পরিচালক, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, টাঙ্গাইল।

কী ঘটেছিল সেই ভাইরাল ভিডিওতে? অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুক্তভোগী গ্রাহকের শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) সহ সকল প্রকার আইনগত নথিপত্রে তাঁর মায়ের নাম ইংরেজি বানানে স্পষ্ট অক্ষরে ‘Johora’ লেখা রয়েছে। তবে কোনো একটি কাগজে হয়তো বাংলায় 'জহুরা' শব্দটি এসেছে। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, এনআইডি এবং সার্টিফিকেটের ইংরেজি নাম অনুসরণ করেই পাসপোর্ট ইস্যু করার কথা। কিন্তু টাঙ্গাইল পাসপোর্ট অফিসের ওই কর্মকর্তা সম্পূর্ণ অবৈধ সুবিধা বা টাকা খাওয়ার উদ্দেশ্যে ফাইলটি আটকে দেন।

ভিডিওতে দেখা যায়, ওই কর্মকর্তা বারবার ভুক্তভোগীকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, “ইংরেজিতে জহুরা (Zohura/Johora-র উচ্চারণ বা বানান বিতর্ক তৈরি করে) করে নিয়ে আসেন।” ভুক্তভোগী নারী যখন বারবার যুক্তি দেখান যে তাঁর সব জায়গায় ইংরেজি বানান 'Johora'-ই আছে, তখনো ওই কর্মকর্তা কোনো যৌক্তিক সমাধান না দিয়ে টেবিল গরম করে ফাইল আটকে রাখেন।

ক্ষুব্ধ নাগরিকদের অভিযোগ: ‘টাকা দিলে কোহরাও সোহরা হয়ে যায়!’: এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ, এই কর্মকর্তা বা পুরো সিন্ডিকেটটি মূলত 'টাকা' না পাওয়ার কারণেই এই সাধারণ নামের অজুহাত দাঁড় করিয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এই অফিসে টাকা দিলে সব ধরনের ভুল বা অসংগতি মুহূর্তেই গায়েব হয়ে যায়। ঘুষের টাকা টেবিলের নিচ দিয়ে পৌঁছালে নাম 'Johora' কেন, 'Kohora' বা 'Sohora' যা ইচ্ছা তা-ই করে দেওয়া সম্ভব হয়।

সবচেয়ে দুঃখজনক ও উদ্বেগের বিষয় হলো, যেখানে বাংলাদেশের বৈধ নাগরিকেরা সব কাগজপত্র জমা দিয়েও মাসের পর মাস পাসপোর্টের জন্য জুতার তলা ক্ষয় করছেন, সেখানে টাকার বিনিময়ে এই অসাধু চক্রের হাত ধরে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নাগরিক জাল এনআইডি ও ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে। এই বৈষম্য ও দুর্নীতির কারণেই দেশের সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির মুখে।

সিস্টেমের দোহাই দিয়ে ‘বেগম পাড়া’ বানানোর উৎসব:নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এই ধরনের দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের কারণেই দেশের সাধারণ মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারি চাকরির পেছনে লাখ লাখ মানুষের এভাবে ছুটে বেড়ানোর মূল কারণই হলো এই 'সিস্টেমের ফাঁকফোকর' ব্যবহার করে অবৈধ আয়ের সুযোগ। এই অবৈধ উপার্জনের টাকা দিয়েই পরবর্তীতে বিদেশে 'বেগম পাড়া' বা বিলাসবহুল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়। এদের শুধু সাময়িক বরখাস্ত বা ওএসডি (OSD) করলেই হবে না, বরং বিভাগীয় মামলার পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মাধ্যমে কঠোর আইনি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরও টাঙ্গাইল আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস এবং ঢাকা সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের থেকে এখন পর্যন্ত কোন বক্তব্য পাওয়া যায়রি।

পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি চাকুরিজীবী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা অনুযায়ী উক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। তবে সাধারণ মানুষের দাবি, তদন্তের নামে যেন সময় পার না করে অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করে ফৌজদারি আইনের আওতায় আনা হোক। অন্যথায় সরকারি সেবা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের অবশিষ্ট বিশ্বাসটুকুও হারিয়ে যাবে।

 

এসআর

সম্পর্কিত খবর