[email protected] রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
২৪ কার্তিক ১৪৩৩

টেকনাফের পাহাড়ে মানবপাচার চক্রের বিস্তার, জিম্মি করে আদায় করা হয় মুক্তিপণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ নভেম্বর ২০২৬ ৭:৪৯ পিএম

সংগৃহীত ছবি

কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মানবপাচারকারীদের তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

 বিদেশে ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যুবকদের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদেরও সেখানে নিয়ে আটকে রাখা হচ্ছে। পরে নির্যাতন ও প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ।

 

গত ৫ নভেম্বর হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালী ও লেদা নুরালীপাড়া সংলগ্ন পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযানে এ অপরাধী চক্রের ভয়াবহ কর্মকাণ্ডের চিত্র সামনে আসে। অভিযানে পাচারকারীদের সশস্ত্র বাধার মুখে পড়েন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান সেনাবাহিনীর সদস্য সৈনিক মো. তিতাস শেখ (২৭)।

 

আইএসপিআর ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা তথ্যে ওই পাহাড়ি এলাকায় ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি সশস্ত্র দল প্রায় ১২০ জন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাকে আটকে রেখেছে বলে জানা যায়। এর ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বিজিবি ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ দল অভিযান পরিচালনা করে।

 

৫ নভেম্বর বিকেল ৫টার দিকে বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পাহাড়ের ওপর থেকে গুলি চালায় পাচারকারীরা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় যৌথ বাহিনীও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে বাঁ কাঁধ ও বুকের পাশে গুলিবিদ্ধ হন সৈনিক তিতাস শেখ। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

 

এ অভিযানে পাচারকারীদের আস্তানা থেকে ৫৭ জন জিম্মিকে উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি অস্ত্রসহ পাঁচজনকে আটক করে যৌথ বাহিনী।

 

যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে পাচার কার্যক্রম

স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় কয়েকটি সংঘবদ্ধ অপরাধী দল মানবপাচার, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের সঙ্গে জড়িত। এসব চক্রে স্থানীয় অপরাধীদের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

 

চক্রের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে যুবকদের মালয়েশিয়ায় ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে টেকনাফে নিয়ে আসে। পরে উপকূলীয় এলাকা কিংবা মেরিন ড্রাইভের আশপাশ থেকে তাদের অপহরণ করে পাহাড়ের গোপন আস্তানায় আটকে রাখা হয়। সেখানে নির্যাতনের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।

 

অপরাধীদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। রঙ্গীখালীর অভিযানে পিস্তল ও দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

 

আতঙ্কে পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা

পাহাড়ে সশস্ত্র অপরাধীদের উপস্থিতির কারণে টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সন্ধ্যার পর পাহাড়ের দিক থেকে গুলির শব্দ শোনা যায় বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

 

রঙ্গীখালীর বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, অপরাধীদের ভয়ে স্থানীয়রা পাহাড়ে যাতায়াত করতে সাহস পান না। জুম চাষ কিংবা কাঠ সংগ্রহের মতো স্বাভাবিক কাজেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হচ্ছে তাঁদের।

 

লেদা এলাকার ব্যবসায়ী রশিদ আহমেদের অভিযোগ, বিভিন্ন স্থান থেকে আসা অপরিচিত ব্যক্তিদের স্থানীয় দালালদের সহায়তায় পাহাড়ের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে হুমকির মুখে পড়তে হয়।

 

হ্নীলা ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা মাস্টার নুরুল ইসলাম বলেন, আগে সাগরপথে মানবপাচারের ঘটনা বেশি আলোচনায় থাকলেও এখন পাহাড়ি এলাকাতেও অপরাধীরা আস্তানা গড়ে তুলেছে। তাঁর মতে, এসব চক্রের তৎপরতা বন্ধে পাহাড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থায়ী নজরদারি প্রয়োজন।

 

চক্রের সদস্যদের ধরতে অভিযান অব্যাহত

মানবপাচার ও অপহরণে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

 

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, রঙ্গীখালী ও লেদা পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি সশস্ত্র চক্র অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। যৌথ বাহিনীর অভিযানে ৫৭ জনকে উদ্ধার এবং পাঁচজনকে অস্ত্রসহ আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের মূল হোতাদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

 

বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ আবু সাঈদ জানান, অপহরণ, ডাকাতি ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ ও ডাকাতির অভিযোগে পাঁচজন এবং মানবপাচারের ঘটনায় ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাচারকারীরা মেরিন ড্রাইভ ও বাহারছড়ার উপকূলীয় এলাকাকে ব্যবহার করে ট্রলারের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের সাগরপথে পাঠানোর চেষ্টা করে। এ কারণে পাহাড় ও উপকূলের সংযোগস্থলে নজরদারি এবং চেকপোস্ট জোরদার করা হয়েছে।

 

১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক কাউছার সিকদার বলেন, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রোহিঙ্গা নাগরিকও রয়েছেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে দালালদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে কিংবা অপহরণ করে পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ক্যাম্পগুলোতে গোয়েন্দা তৎপরতা ও বিশেষ অভিযান বাড়ানো হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, টেকনাফের পাহাড় ও উপকূলকেন্দ্রিক মানবপাচার বন্ধে অপরাধী চক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি গোটা এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি।

এফ/ডি

সম্পর্কিত খবর