রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, খামারিদের মধ্যে উপকরণ বিতরণ এবং উপকারভোগীদের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত বা সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া নথি অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মো. রেজাউল করিম নামের এক ব্যক্তি তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় আবেদন করেন। এতে রাজশাহীর গোদাগাড়ীসহ বিভিন্ন উপজেলায় লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (এলডিডিপি) অধীনে পরিচালিত কার্যক্রম, বরাদ্দ, খামারিদের দেওয়া উপকরণ এবং উপকারভোগীদের তালিকা চাওয়া হয়। ডাকযোগে আবেদনের পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ইমেইলেও আবেদনটি পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু ২৬ অক্টোবর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমান স্বাক্ষরিত ‘ফরম খ’-এর মাধ্যমে তথ্য সরবরাহে অপারগতার কথা জানানো হয়। নোটিশে বলা হয়, আবেদনকারীর চাওয়া তথ্য জেলা কার্যালয়ে সংরক্ষিত নেই। প্রকল্পটি ঢাকার প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে পরিচালিত এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে জেলা পর্যায়ে প্রকল্পের তদারকি ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব থাকায় সংশ্লিষ্ট নথির অনুলিপি বা প্রতিবেদন জেলা কার্যালয়ে থাকার কথা বলে মনে করছেন স্থানীয় খামারিদের কেউ কেউ। তাদের প্রশ্ন, প্রকল্পের কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব পালন করা হলে সংশ্লিষ্ট তথ্যের কোনো রেকর্ড জেলা দপ্তরে নেই কেন?
প্রণোদনা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ
এলডিডিপি প্রকল্পের আওতায় খামারিদের জন্য বরাদ্দ করা বিভিন্ন উপকরণ বিতরণ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রদর্শনীর সরঞ্জাম, ওষুধ, দানাদার খাদ্য ও খামারসামগ্রী বিতরণের কাগজপত্রে শতভাগ সরবরাহ দেখানো হলেও অনেক প্রকৃত খামারি এসব সুবিধা পাননি। উপকারভোগীদের তালিকায় অনিয়মের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করেছেন তারা।
এ ছাড়া বাণিজ্যিক ডেইরি ও পোল্ট্রি খামার এবং ফিড লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন, ভেটেরিনারি সেবার অনুমোদন এবং টিকা ও কৃমিনাশক ওষুধ সরবরাহের ক্ষেত্রে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। মাঠপর্যায়ের ভেটেরিনারি সার্জন ও ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্টদের বদলি-পদায়ন, প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন কেনাকাটার বিল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
সাংবাদিকের প্রশ্নে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার অভিযোগ
এসব অভিযোগ এবং তথ্য সরবরাহে অপারগতার কারণ জানতে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। এ সময় তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে প্রতিবেদককে তাঁর কার্যালয়ে যেতে বলেন। তিনি বলেন, ‘আপনি অফিসে আসেন। আগে আমার পদমর্যাদাটা বোঝেন, আমি কে!’
প্রতিবেদকের অভিযোগ, এ সময় তিনি সাংবাদিকদের দেখে নেওয়ার হুমকিও দেন। পাশাপাশি দাবি করেন, চাওয়া তথ্য জেলা কার্যালয়ে সংরক্ষিত থাকে না।
অন্যদিকে রাজশাহী বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. আনন্দ কুমার অধিকারী বলেন, এলডিডিপি প্রকল্পের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রকল্পটি ঢাকা থেকে পরিচালিত হতো এবং উপজেলা পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মূলত মনিটরিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এ কারণে তাঁর কার্যালয়ে প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য না-ও থাকতে পারে।
তবে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর জানা নেই বলে জানান বিভাগীয় পরিচালক।
এদিকে প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, উপকরণ বিতরণ এবং তথ্য অধিকার আইনে আবেদন প্রত্যাখ্যানের বিষয়গুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় খামারি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপও কামনা করেছেন তারা।
এফ/ডি