[email protected] বৃহঃস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
৬ কার্তিক ১৪৩৩

একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির: লালমনিরহাটে দুই শতকের সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর ২০২৬ ৯:১০ এএম

সংগৃহীত ছবি

একই উঠোনে পাশাপাশি অবস্থান করছে দুটি উপাসনালয়—একদিকে ভেসে আসে আজান ও

 খুতবার ধ্বনি, অন্যদিকে ঢাকঢোল ও উলুধ্বনিতে মুখরিত হয় পূজা-অর্চনা। দুটির মাঝে ব্যবধান কেবল তিন ফুটের একটি দেয়াল। ভিন্ন ধর্ম ও প্রার্থনা পদ্ধতি হলেও নেই কোনো বিভেদ, সংশয় কিংবা সহিংসতা। লালমনিরহাট জেলা শহরের পুরান বাজার কালীবাড়ি এলাকায় প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির বার্তা বহন করে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘পুরান বাজার জামে মসজিদ’ ও ‘কালীবাড়ি মন্দির’।

​স্থানীয় ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ১৮৮ বছর আগে, ১৮৩৬ সালে পুরান বাজার এলাকায় কালীবাড়ি মন্দিরটি স্থাপিত হয়। পরবর্তী সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের তাগিদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীরা এই এলাকায় বসতি ও ব্যবসা শুরু করেন। তারা মন্দিরের পাশেই সাময়িকভাবে একটি টিনের ঘরে সালাত আদায় শুরু করেন, যা কালক্রমে পূর্ণাঙ্গ ‘পুরান বাজার জামে মসজিদ’ হিসেবে গড়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামো পাকা হলেও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অপরিবর্তিত রয়েছে।

​সম্প্রীতির এই চর্চা নিয়ে মসজিদের মোয়াজ্জেম রফিকুল ইসলাম জানান, দীর্ঘ দিন ধরে দায়িত্বে থেকে তিনি কখনো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেখেননি। একে অপরের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে পাশাপাশি অবস্থান করাটা তাদের কাছে অত্যন্ত গর্বের ও ভালোবাসার বিষয়।

​অন্যদিকে কালীবাড়ি মন্দিরের পুরোহিত সুমন কুমার চক্রবর্তী বলেন, শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে দুই ধর্মের মানুষ একত্রে নিজ নিজ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করছেন। আজান ও নামাজের সময় সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া প্রধান প্রধান ধর্মীয় উৎসবে মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সার্বিক সহযোগিতা পাওয়া যায়।

​লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান এই সহাবস্থানকে প্রশংসনীয় উল্লেখ করে জানান, সামাজিকভাবেই এই এলাকায় চমৎকার একটি পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রয়েছে।

​জেলা প্রশাসক মুহা. রাশেদুল হক প্রধান মন্তব্য করেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় সহনশীলতার এই দৃষ্টান্ত কেবল লালমনিরহাটের জন্য নয়, বরং পুরো দেশের জন্যই একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। জেলা প্রশাসন এই ঐতিহ্য বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।

​শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে কালীবাড়ি মন্দির পরিদর্শনে গিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু একে দেশের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, যুগের পর যুগ ধরে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় শান্তিতে বসবাস করছেন। নামাজের সময় বাদ্যযন্ত্র বা মাইক বন্ধ রাখা এবং পূজায় মুসলিমদের সহযোগিতা করার যে চর্চা রয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এক ধর্মের প্রতি অন্য ধর্মের এই বিশ্বাস ও ভালোবাসার বন্ধন যেন যুগ যুগ ধরে টিকে থাকে।

এসআর

সম্পর্কিত খবর