[email protected] শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
১৫ ফাল্গুন ১৪৩২

পিরোজপুরে ১০৮ চুলায় চিতই পিঠার উৎসব

বরিশাল জেলা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ৫:১৯ পিএম

সংগৃহীত ছবি

শীতের কনকনে আবহ উপেক্ষা করে পিরোজপুরের নাজিরপুরে আবারও বসেছে চিতই পিঠার ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।

কুয়াশার ভেতর মাটির চুলার ধোঁয়া, গরম পিঠার সুবাস আর মানুষের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে কালীমন্দির প্রাঙ্গণ।

সারিবদ্ধভাবে জ্বলে ওঠা ১০৮টি মাটির চুলা ঘিরে নারীদের ব্যস্ত হাত আর হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে এবারের চিতই পিঠা উৎসব রূপ নেয় এক মিলনমেলায়।

রোববার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় সদর ইউনিয়নের কুমারখালী বাজারসংলগ্ন দেবলাল চক্রবর্তীর বাড়ির কালীমন্দিরে শুরু হয় এই শতবর্ষী উৎসব।

রাতভর চলা আয়োজন শেষ হয় সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকালে। ধর্মীয় আচারকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি এখন সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে পরিণত হয়েছে একটি লোকজ উৎসবে।


উৎসবস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মাটির সাজ ও সরা বসানো ১০৮টি চুলা সারিবদ্ধভাবে স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে আগত নারীরা চালের গুঁড়া দিয়ে একের পর এক চিতই পিঠা তৈরি করছেন। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ভিড়।

কেউ মানত পূরণের আশায়, কেউ ভক্তি নিয়ে, আবার কেউ কেবল উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে আসেন। অনেকেই সঙ্গে করে নিয়ে আসেন চালের গুঁড়া, জ্বালানি কাঠ ও বাঁশ।


সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুরোহিত দেবলাল চক্রবর্তীর মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসব শুরু হয়। প্রতিটি চুলায় আগুন জ্বালানোর পর নারীরা পিঠা বানানো শুরু করেন।

প্রস্তুত পিঠা বড় পাত্রে জমা করে দেবীর ভোগে নিবেদন করা হয়। পরে প্রসাদ হিসেবে তা উপস্থিত দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।


বরিশাল থেকে আসা পুণ্যার্থী সুমিত্রা রানী দাস বলেন, শৈশবে মায়ের হাত ধরে এখানে আসতাম। বিয়ের পর দূরে থাকলেও এই উৎসবের কথা মনে পড়লেই মন ছুটে আসে। এখানকার পিঠার স্বাদে আমার ছোটবেলার স্মৃতি জড়িয়ে আছে।


শ্যামা পাল জানান, দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়ায় গত বছর এখানে মানত করেছিলেন। এরপরই সুখবর আসে। এবার সন্তানকে কোলে নিয়েই পিঠা বানাতে এসেছেন তিনি।


স্থানীয় বাসিন্দা রাহুল বিশ্বাস বলেন, আগে এটি মূলত মানতের আয়োজন ছিল। এখন এটি পুরো এলাকার সবচেয়ে বড় উৎসবে পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এখানে একত্রিত হয়।


মনোবাসনা পূরণের আশায় আসা এক মুসলিম নারী বলেন, বিশ্বাসের জায়গা তো সবার জন্য। তাই আশা নিয়ে এখানে এসেছি।


মন্দিরের পুরোহিত দেবলাল চক্রবর্তী জানান, প্রায় ৯২ বছর আগে তার পূর্বপুরুষ হরষিত আনন্দ চক্রবর্তী মাঘের অমাবস্যায় এই স্থানে মেলার সূচনা করেন। তখন অমাবস্যায় শুকনো খাবার গ্রহণের রীতি ছিল।

সেখান থেকেই চিতই পিঠা তৈরি করে প্রসাদ বিতরণের প্রথা চালু হয়। সময়ের সঙ্গে পুণ্যার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় এই আয়োজন আজ বৃহৎ উৎসবে রূপ নিয়েছে।


দীর্ঘ শতবর্ষের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা এই চিতই পিঠা উৎসব এখন আর শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং নাজিরপুরের ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

এসআর

মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর