ভাসানচরের ছয়টি মৌজাকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার পরিবর্তে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ
উপজেলার অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবকে ঘিরে নোয়াখালী জেলাজুড়ে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দারা এটিকে নিজেদের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় গঠিত একটি কারিগরি কমিটি ভাসানচরকে সন্দ্বীপের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেয়। সেই প্রতিবেদনের আলোকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ শাখা গত ১৩ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা পাঠায়।
এই খবর প্রকাশের পরপরই নোয়াখালীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাদের দাবি, ভাসানচরকে দীর্ঘদিন ধরেই হাতিয়া উপজেলার অংশ হিসেবে প্রশাসনিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দিয়ারা জরিপের মাধ্যমে চূড়ান্ত রেকর্ড প্রকাশ, চর ঈশ্বর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্তি এবং ভাসানচর থানা গঠন—সবই শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে ভাসানচরকে বিতর্কিত ইস্যু বানিয়ে এলাকার স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চেষ্টা করছে।
ইতিহাস তুলে ধরে স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৬০-এর দশক থেকে হাতিয়া উপজেলায় ভয়াবহ নদীভাঙন শুরু হয়। গত প্রায় সাত দশকে মেঘনা নদীর ভাঙনে হাতিয়ার বিশাল এলাকা বিলীন হয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে সাহেবানীর চরসহ বহু বসতি। সেই বাস্তবতায় বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা ভাসানচরকে হাতিয়ার স্বাভাবিক ভৌগোলিক সম্প্রসারণ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
২০১০ সালে ভাসানচর দৃশ্যমান হলেও ২০১৭ সালে সেখানে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দ্বীপটি জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পায়। ওই বছর সরকারি জরিপের মাধ্যমে ভাসানচরকে হাতিয়া উপজেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর আগে বন বিভাগ সেখানে বনায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং বর্তমানে সব প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হাতিয়া উপজেলার অধীনেই পরিচালিত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারি গেজেট ও বিদ্যমান প্রশাসনিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে ভাসানচরকে সন্দ্বীপের সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে হাতিয়াসহ জেলা ও রাজধানীতে ‘ভাসানচর রক্ষা আন্দোলন’ অব্যাহত রয়েছে।
হাতিয়ার বাসিন্দা মো. আজম বলেন, বছরের পর বছর নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের জন্য ভাসানচর আশার প্রতীক। নতুন করে জেগে ওঠা এই ভূমি হারালে তারা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বেন।
স্থানীয় শিক্ষক ইব্রাহিম হোসেন বলেন, এটি শুধু জমির প্রশ্ন নয়, এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। ঐতিহাসিক, প্রশাসনিক ও বাস্তব—সব দিক থেকেই ভাসানচর হাতিয়ার অংশ।
আরেক শিক্ষক রওশন আরা বেগম বলেন, প্রয়োজনে নারীসমাজও রাজপথে নামবে। ভাসানচর রক্ষায় কোনো আপস করা হবে না।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের প্রার্থী আব্দুল হান্নান মাসউদ আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের মাধ্যমেই ভাসানচর হাতিয়ার অধিকার রক্ষা করা হবে।
একই অবস্থান জানিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও নোয়াখালী-৬ আসনের প্রার্থী মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, হাতিয়ার এক ইঞ্চি ভূমিও দখল হতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে রাজপথ ও আইনি লড়াই—দুটিই চালানো হবে।
এসআর
মন্তব্য করুন: